হাসিব আবেদীন
ক্যান্সার পৃথিবীতে মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। ২০২১ সালে আনুমানিক ২ কোটি মানুষের দেহে ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছে। যার মধ্যে মারা গেছে ১ কোটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আশঙ্কা করছে সামনের দশকে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। তবে আশার কথা হচ্ছে, সচেতনতা বৃদ্ধি করলে মৃত্যুর দুয়ার চিরতরে বন্ধ করা সম্ভব।
ক্যান্সার চিকিৎসার বাস্তবতা দেশের আর্থসামাজিক বৈষম্য স্পষ্ট ফুটিয়ে তুলে ধরছে। উচ্চ এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য হলো শতকরা ৯০ ভাগের বেশি ধনী দেশ সম্পূর্ণ চিকিৎসার আওতায় এসেছে। অপর দিকে শতকরা ১০ ভাগের কম নিম্ন আয়ের দেশ সামান্য চিকিৎসা পাচ্ছে। শতকরা ৮০ ভাগের বেশি ধনী দেশে শিশুদের ক্যান্সার শনাক্ত করার পদ্ধতির আওতায় আনা যাচ্ছে। ধনী দেশগুলোতে আক্রান্তের ৫ বছর পর সুস্থ হয়ে ওঠা স্তন ক্যান্সার রোগীদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে শতকরা ৮০ ভাগের বেশি। তবে ভারতে শতকরা ৬৬ ভাগ স্তন ক্যান্সার রোগী আরোগ্য লাভ করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় স্তন ক্যান্সার নিরাময় করতে পেরেছে শতকরা ৪০ ভাগ।
সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি জরিপে দেখা যায় শতকরা ৩৭ ভাগ দরিদ্র দেশে সরকারিভাবে ক্যান্সার চিকিৎসা দেওয়া হয়। অপরদিকে শতকরা ৭৮ ভাগ ধনী দেশে সরকার ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যয় বহন করে। এর অর্থ দাঁড়ায় ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থা একটি পরিবারকে দারিদ্র্যের পথে এগিয়ে দিচ্ছে। করোনা মহামারিতে এ পরিস্থিতি আরও প্রকট হয়েছে।
তাই বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান সম্পদ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বৈষম্যকে স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বছর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘ক্লোজিং দ্যা কেয়ার গ্যাপ’। যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘চিকিৎসা ব্যবস্থায় অসমতার অবসান’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ পর্যন্ত বেশ কিছু দেশে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যব্যবস্থা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন স্তন ক্যান্সার এবং জারায়ুর ক্যান্সার নিরাময়ে মনোযোগ দিয়েছে। তারা দরিদ্র দেশে মানসম্পন্ন চিকিৎসাব্যবস্থা পৌঁছে দিতে চেষ্টা করছে।
২০০টির বেশি অংশীদার দেশ ও প্রতিষ্ঠানকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। ক্যান্সার গবেষণা, প্রতিরোধ এবং চিকিৎসায় তারা বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে৷
উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা পৌঁছে দিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জাতীয় ক্যান্সার কেন্দ্রের ভূমিকায় গুরুত্ব আরোপ করেছে। জাতীয় ক্যান্সার কেন্দ্র ক্যান্সার প্রতিরোধে সকল পরিষেবা যেমন রোগ নির্ণয়, সহায়ক ও বহুবিভাগীয় চিকিৎসা এক ছাদের নিচে নিয়ে আসায় রোগীরা খুব সহজে সেবা নিতে পারছে। আর জাতীয় ক্যান্সার কেন্দ্রগুলো প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা কেন্দ্র হিসাবে কাজ করায় দেশের সক্ষমতা ও চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।
বিশ্ব ক্যান্সার দিবসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা একটি ক্যান্সার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং বিদ্যমান কেন্দ্রে পরিষেবা বৃদ্ধি করতে একটি কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছে। এ কাঠামো নীতি নির্ধারক, প্রকল্প পরিচালক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ মানব সম্পদ ও সরঞ্জাম প্রদান করবে।
ক্যান্সার প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে স্ক্রিনিং। কিন্তু একটি ক্যান্সার প্রকল্পে কী কী থাকবে তা কিছু জটিল বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ে একটি সংক্ষিপ্ত নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে।
ক্যান্সার চিকিৎসায় সবচেয়ে সাশ্রয়ী, কার্যকরী এবং ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত পদ্ধতি হলো রেডিওথেরাপী। কিন্তু এখন পর্যন্ত নিম্ন আয়ের দেশগুলো রেডিওথেরাপির আওতায় আসতে পারেনি।
তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আইএইএ এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে "রেইজ অব লাইট" নামের একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। যেসব দেশে রেডিওথেরাপি সহজলভ্য নয় সেখানে প্রযুক্তি পৌছে দিতে এ প্রকল্প কাজ করবে।
ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন