• ঢাকা শুক্রবার
    ২৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১১ বৈশাখ ১৪৩৩
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি

প্রসিকিউশনের উদাসীনতায় ১৩ বছর ঝুলছে বিচার

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ১২:১৯ পিএম

প্রসিকিউশনের উদাসীনতায় ১৩ বছর ঝুলছে বিচার

সিটি নিউজ ডেস্ক

শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বের ইতিহাসে শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে অন্ধকার এবং শোকাবহ দিনগুলোর একটি ২৪ এপ্রিল। ঠিক ১৩ বছর আগে ২০১৩ সালের এই দিনে সাভারের রানা প্লাজা ধসের ভয়াল ঘটনায় ১ হাজার ১৩৬ জন পোশাক শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়, আহত ও পঙ্গু হন প্রায় ৩ হাজার শ্রমিক।

ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া শ্রমিকদের আর্তনাদ আর স্বজনদের কান্নায় সেদিন ভারী হয়ে উঠেছিল সাভারের আকাশ-বাতাস। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় পার হলেও অধিকাংশ শ্রমিক ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাননি।

বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতিতে চলায় আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
স্বজন হারানো পরিবারগুলো এবং বেঁচে ফেরা পঙ্গু শ্রমিকরা আজও ক্ষতিপূরণ ও বিচারের আশায় আদালতের বারান্দায় আর পথে পথে ঘুরছেন।

ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের করুণ চিত্র

দীর্ঘ ১৩ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ বা দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন পায়নি অনেক আহত শ্রমিক এবং নিহতদের পরিবার। রানা প্লাজা ধসের পরপরই দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা, বায়ার বা ব্র্যান্ড এবং সরকারের তরফ থেকে কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল।

রানা প্লাজা ডোনার্স ট্রাস্ট ফান্ড নামের একটি তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণের নামে কিছু অর্থ বণ্টন করা হলেও, শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে সেটি ছিল স্রেফ ‍‍`অনুদান‘। শ্রম আইন অনুযায়ী একজন শ্রমিকের সারাজীবনের আয়ের সমপরিমাণ যে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা, তা আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

যারা হাত-পা হারিয়েছেন, মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়ে পঙ্গু হয়েছেন, তাদের চিকিৎসার খরচ মেটাতেই সেই অনুদানের টাকা শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

বিচারে অত্যন্ত ধীরগতি ও হতাশা

বিচারের অবস্থা হতাশাজনক এবং তা চলছে কচ্ছপগতিতে। রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় ৫৯৪ জন সাক্ষী রয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ ১৩ বছরেও অধিকাংশ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়নি।

রাষ্ট্রপক্ষের গাফিলতি, বারবার সময় পেছানো এবং আইনি জটিলতার কারণে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ভবনের মালিক প্রধান আসামি সোহেল রানাসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম এখনো চলছে এবং এখন পর্যন্ত কোনো দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত হয়নি।

সময়ের পরিক্রমায় অনেক সাক্ষী স্মৃতি হারিয়েছেন, অনেকে ঠিকানা বদলেছেন, আবার অনেকে হতাশ হয়ে সাক্ষ্য দিতেই আসছেন না। এই সুযোগে আসামিপক্ষ পার পেয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

এ বিষয়ে দীর্ঘ আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, খুবই দুঃখজনক ব্যাপার, এই ১৩ বছরেও যে শ্রমিকরা নিহত হয়েছেন, যে শ্রমিকরা আহত হয়েছেন, নিখোঁজ হয়েছেন, তাদের কেউ কোনো খোঁজখবর নেয়নি। যাদের দায়িত্ব ছিল—আজকে এখানে সরকারের কথা যদি বলি, গার্মেন্টস মালিকদের কথা যদি বলি, কেউই কিন্তু আসলে কোনো খবর নেয়নি। একটি তদন্ত বা সহায়তা কমিটি করে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেই কমিটির কেউই আর খোঁজ নেয়নি যে এই নিহত শ্রমিকদের পরিবারগুলো আজ কেমন আছে, কী রকম জীবনযাপন করছে। এদিকে কারোরই কোনো খেয়াল নেই।

শ্রমিকদের পুনর্বাসন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মোশরেফা মিশু বলেন, আহত শ্রমিক যারা বেঁচে ফিরেছেন, তাদের অনেকেই শারীরিক ত্রুটি নিয়ে ধুঁকছেন। আমাদের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এমন অনেক প্রকল্প বা কাজ আছে, যাতে এই শারীরিক ত্রুটি নিয়েও তারা কাজ করতে পারেন এবং স্বাবলম্বী হতে পারেন। কিন্তু আমরা দেখলাম, ১৩ বছরেও এই শ্রমিকদের পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা রাষ্ট্র করেনি। তাদের সুচিকিৎসা করা হয়নি। দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার অভাবে অনেকেই আজ কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। একটু স্থায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলে হয়তো তাদের অনেকেই আজ সুস্থ হতে পারতেন। এই সবকিছুই আমাদের জন্য চরম লজ্জার ও দুঃখজনক।

বিদেশি অনুদানকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, ক্ষতিপূরণের কথা যদি দেখেন, বিদেশি যেসব ব্র্যান্ড রানা প্লাজায় কাজ করত, তারা কিছু অনুদান দিয়েছে। এই অনুদানকেই ক্ষতিপূরণ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু শ্রম আইন অনুযায়ী যিনি নিয়োগকর্তা, তিনিই ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য—এটাই হলো আন্তর্জাতিক ও দেশীয় নিয়ম। কিন্তু প্রকৃত নিয়োগকর্তারা তো কোনো ক্ষতিপূরণ দেননি।

কারখানার বর্তমান কর্মপরিবেশ এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট টেনে এই শ্রমিক নেতা বলেন, ১৩ বছর আগে থেকেই আমরা বলে আসছিলাম গার্মেন্টসগুলোর অবস্থা অত্যন্ত খারাপ, অমানবিক। শ্রমিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। মালিকপক্ষ ও তাদের লোকজনের দুর্ব্যবহার, কারখানার বাইরে সন্ত্রাসীদের হাতে বেতন ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। রানা প্লাজা এবং তাজরীন ফ্যাশনস অগ্নিকাণ্ডের পর সারা পৃথিবী জানতে পেরেছিল আমাদের শ্রমিকরা কী নরকতুল্য পরিবেশে কাজ করে।

তিনি বলেন, শুরুতে আন্তর্জাতিক মহলের কিছুটা সহানুভূতি থাকলেও ১৩ বছর পরে এসে সবাই তা ভুলে গেছে। ১ হাজার ১৩৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু ও আড়াই হাজার শ্রমিকের পঙ্গুত্ব আজ যেন শুধুই পরিসংখ্যান। অথচ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে এই শ্রমজীবী মানুষরাই সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণ করেছে এবং জীবন দিয়েছে। খোদ জাতিসংঘের রিপোর্ট বলছে, অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে শ্রমজীবী মানুষের। কিন্তু ‍‍`বৈষম্যবিরোধী‍‍` স্লোগানে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখানো হলো, সেখানেও আমরা দেখলাম শ্রমিকের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বৈষম্যহীন সমাজ আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরং শ্রমিকের প্রতি শোষণ ও নিপীড়ন আগের মতোই রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক কাজী রুহুল আমিন বলেন, পোশাক শ্রমিকরা এখনো দাসের মতো মানবেতর পরিবেশে কাজ করছেন। কারখানাগুলো কারখানার বদলে একেকটি ‍‍`কারাগার‍‍` হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রমিকদের সেখানে কোনো স্বাধীনতা নেই, নেই কথা বলার অধিকার।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে রুহুল আমিন বলেন, কারখানায় এখনো নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। বর্তমান ও অতীতের কোনো সরকারই শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবিগুলো আমলে নেয়নি। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাপে ‍‍`অ্যাকর্ড‍‍` (Accord) এবং ‍‍`অ্যালায়েন্স‍‍` (Alliance) গঠিত হওয়ায় কারখানার ভবন ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তায় কিছুটা উন্নতি দৃশ্যমান হয়েছিল। কিন্তু সামগ্রিক পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইএলও কনভেনশন ১৫৫ ও ১৮৭ এবং আমাদের দেশীয় শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের যে পেশাগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা ছিল, তা এখনো অধরাই রয়ে গেছে। এর ফলে শ্রমিকরা এখনো কারখানায় নানা দুর্ঘটনায় ও পেশাগত অসুস্থতায় অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন। আমরা আশা করেছিলাম, রানা প্লাজায় ১১ শতাধিক শ্রমিকের জীবনের বিনিময়ে অন্তত এই মানবেতর জীবনযাপনের অবসান হবে। কিন্তু আমরা এখনো সেই অন্ধকার তিমিরেই রয়ে গেছি।

শ্রমিকদের বর্তমান অর্থনৈতিক দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে কাজী রুহুল আমিন আরও বলেন, বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতির বাজারে শ্রমিকদের জন্য জীবনধারণ উপযোগী কোনো মজুরি নেই। তাদের জন্য নেই কোনো রেশনিং ব্যবস্থা, খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা। সারাজীবন কারখানায় হাড়ভাঙা খাটুনি খাটার পর চাকরি শেষে তাদের জন্য নেই কোনো পেনশনের ব্যবস্থা। এই নামমাত্র বেতনে শ্রমিকরা আজ তাদের নিজেদের পুষ্টিকর খাবারই জোগাড় করতে পারছেন না, সন্তানদের শিক্ষা বা চিকিৎসার খরচ মেটানো তো দূরের স্বপ্ন।

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি কেবল একটি ভবনের ধস ছিল না, এটি ছিল একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা, মালিকপক্ষের সীমাহীন লোভ এবং রাষ্ট্রের নজরদারির অভাবের চরম পরিণতি। ১৩ বছর পর আজকের দিনে দাঁড়িয়ে শ্রমিকদের একটাই প্রশ্ন—আর কত বছর অপেক্ষা করলে রানা প্লাজার শহীদরা ন্যায়বিচার পাবেন? আর কত রক্ত দিলে এদেশের শ্রমিকরা একটি নিরাপদ, সম্মানজনক ও বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ লাভ করবেন?

রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষ যদি এখনো শিক্ষা না নেয়, তবে রানা প্লাজার মতো ট্র্যাজেডি যে ভবিষ্যতে আর ঘটবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে দোষীদের শাস্তি প্রদান এবং শ্রমিকদের জীবনধারণের উপযোগী মজুরি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হতে পারে নিহত শ্রমিকদের প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা।

জাতীয় সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ