• ঢাকা শনিবার
    ১১ জুলাই, ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩

বন্যার সময় রাজনীতি নয়, মানুষের জীবন বাঁচানোই হোক সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২৬, ১২:২৪ এএম

বন্যার সময় রাজনীতি নয়, মানুষের জীবন বাঁচানোই হোক সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

সৈয়দ আতিক

বাংলাদেশে বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যার প্রকোপ, স্থায়িত্ব এবং ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বেড়েছে। প্রতি বছরই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চল পানিতে ডুবে যায়, হাজারো পরিবার গৃহহীন হয়, কৃষকের ফসল নষ্ট হয়, শিক্ষা ব্যাহত হয় এবং জীবিকার চাকা থমকে দাঁড়ায়। তাই বন্যাকে এখন কেবল একটি মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও মানবিক সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে বন্যাকবলিত জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা, উদ্ধার, ত্রাণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। বিশেষ করে নারী, শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগের সুযোগে অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ মানবিক ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।

তবে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়নের গুরুত্ব অনেক বেশি। রাজধানী থেকে যত নির্দেশই আসুক না কেন, তার সফলতা নির্ভর করে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ওপর। অতীতে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ পড়া কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এবার সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়।

বন্যা মোকাবিলায় সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলোর একটি হলো বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবা। বন্যার পরপরই ডায়রিয়া, পানিবাহিত রোগ, সাপের কামড়, চর্মরোগ এবং অপুষ্টির ঝুঁকি বেড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পর্যাপ্ত চিকিৎসক, ওষুধ, মোবাইল মেডিকেল টিম এবং নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য এবং গর্ভবতী নারীদের বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

কৃষি খাতের ক্ষতিও সমান গুরুত্বের দাবি রাখে। ফসলহানি, মাছের ঘের ও পুকুর ভেসে যাওয়া, গবাদিপশুর ক্ষতি—এসবের প্রভাব শুধু কৃষকের পরিবারেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও বাজার ব্যবস্থায়। তাই পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, বীজ, সার এবং প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দ্রুত পৌঁছে দিতে হবে।

এটিও মনে রাখতে হবে যে, দুর্যোগ কখনো রাজনৈতিক বিভাজন মানে না। বন্যার পানি যেমন দল-মত দেখে ঘরে ঢোকে না, তেমনি ত্রাণ ও পুনর্বাসনও দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে হওয়া উচিত নয়। এই সময় সরকার, বিরোধী রাজনৈতিক দল, সশস্ত্র বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিক—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। জাতীয় দুর্যোগে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই।

দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা। নদী ব্যবস্থাপনা, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, আগাম সতর্কীকরণ প্রযুক্তি, জলাধার সংরক্ষণ এবং জলবায়ু অভিযোজনভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় আরও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। প্রতিবছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি রোধে স্থায়ী সমাধানের পথেই এগোতে হবে।

বন্যার এই সংকটে দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জীবন রক্ষা, মানবিক সহায়তা এবং দ্রুত পুনর্বাসন। রাজনৈতিক বিতর্কের সময় পরে আসতে পারে; কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে খাবার, অসুস্থ মানুষের কাছে চিকিৎসা এবং গৃহহীন পরিবারের মাথার ওপর নিরাপদ আশ্রয় পৌঁছে দেওয়ার কাজটি বিলম্ব সহ্য করে না। দুর্যোগের এই সময়ে মানবিকতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান শক্তি।

মতামত সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ