প্রকাশিত: আগস্ট ৩, ২০২৬, ১২:২৭ এএম
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই প্রবাসী আয় প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে বাংলাদেশ। জুলাই মাসে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে এসেছে ২৮৬ কোটি (২.৮৬ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা আগের মাস এবং আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি। তবে রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রবাহ সত্ত্বেও জ্বালানি ও সার আমদানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় ডলারের বাজারে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ১২২ টাকার ঘরে থাকা আন্তঃব্যাংক ডলারের বিনিময় হার রোববার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৮২ পয়সায়। এক মাস আগে একই দিনে এ হার ছিল ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৫.২৬ বিলিয়ন ডলার বা ১৭.৩৪ শতাংশ বেশি। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স বেড়েছিল ৬.৪২ বিলিয়ন ডলার বা ২৬.৮৩ শতাংশ। টানা দুই অর্থবছরের এই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতাই চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসেও বজায় রয়েছে।

তবে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্য প্রধান উৎসগুলো একইভাবে ইতিবাচক অবস্থানে নেই। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬৭.৭৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.৭৬ বিলিয়ন ডলার বা ৫.৮৮ শতাংশ বেশি। বিপরীতে একই সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে ৮৩ কোটি ডলার বা ২.০৮ শতাংশ। ফলে ডলারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে এবং আমদানি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স লেনদেন—সব ক্ষেত্রেই ডলারের খরচ বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ডলারের বাজারে চাপ সৃষ্টির প্রধান কারণ জ্বালানি ও সার আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে শুধু পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৯.০৩ বিলিয়ন ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় ছিল ৪.৮৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এ খাতে ব্যয় বেড়েছে ৪.১৫৫৫ বিলিয়ন ডলার বা ৮৫.২২ শতাংশ। একই সময়ে সার আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৪৩.৩০ শতাংশ, অর্থমূল্যে যা ১.০৯ বিলিয়ন ডলার। যদিও ভোগ্যপণ্য, মধ্যবর্তী শিল্পপণ্য এবং তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানির ব্যয় কমে যাওয়ায় ডলারের ওপর আরও বড় চাপ তৈরি হয়নি।
ডলারের বাড়তি চাপের সুযোগ নিয়ে কোনো ব্যাংক যাতে অস্বাভাবিকভাবে বিনিময় হার বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত তদারকি করছে এবং রোববারও কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক করেছে।
এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই শেষে গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬.৫৬ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম৬ (BPM6) পদ্ধতিতে রিজার্ভ রয়েছে ৩১.৭৫ বিলিয়ন ডলার। তুলনায় আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় গ্রস রিজার্ভ ছিল ২৫.৯২ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম৬ অনুযায়ী ২০.৪৮ বিলিয়ন ডলার। যদিও ২০২১ সালের আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল, পরে অর্থপাচার, হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রির কারণে তা ধারাবাহিকভাবে কমে যায়। সেই সময় ডলারের দর ৮৪ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা ছাড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জ্বালানি, সারসহ কয়েকটি খাতে বড় অঙ্কের আমদানি দায় পরিশোধের কারণে আপাতত ডলারের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। তবে এটিকে সাময়িক চাপ হিসেবে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাঁর ভাষ্য, অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি এবং হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের ফলে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী রয়েছে, যা সামনের মাসগুলোতেও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে সহায়তা করবে।