• ঢাকা বুধবার
    ১২ আগস্ট, ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে ভয়াবহ সংঘর্ষ, ৭ নৌসেনা নিহতের দাবি

প্রকাশিত: আগস্ট ১২, ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে ভয়াবহ সংঘর্ষ, ৭ নৌসেনা নিহতের দাবি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মার্কিন নৌবাহিনীর পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এ ক্রুদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষে সাত মার্কিন নৌসেনা নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন—এমন দাবি করেছে ইরানের সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি। পরে ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সিও ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ বা মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে সাতজন নিহত হওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।  

কী ঘটেছিল বলে দাবি

মেহর নিউজের প্রতিবেদনে তাসনিমের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে রণতরীটি মোতায়েন থাকার কারণে জাহাজটির ক্রুদের মধ্যে অসন্তোষ ও চাপ বাড়ছিল। এ নিয়ে নাবিকদের পরিবারের সদস্যরাও উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন এবং দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিলেন।

তাসনিমের দাবি অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ে ক্রুদের সঙ্গে কথা বলতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের একজন উপদেষ্টা রণতরীটিতে যান। সেখানে তিনি ক্রুদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় কয়েকজন নাবিক অসন্তোষ প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে তাকে দুয়োধ্বনি দেওয়া এবং পানির বোতল ছোড়ার ঘটনাও ঘটে বলে ইরানি সূত্রের দাবি।  

এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ক্রুদের মধ্যে হাতাহাতি ও সংঘর্ষ শুরু হয়। তাসনিমের দাবি, সংঘর্ষে ছুরি ও অন্যান্য ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। এতে সাতজন নৌসেনা নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে এই ঘটনার বিস্তারিত—কখন, কোথায় এবং ঠিক কীভাবে সংঘর্ষ শুরু হয়—এসব বিষয়ে এখনো স্বাধীন কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায়নি।

দীর্ঘ মোতায়েন নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ

তবে আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান এবং ক্রুদের ওপর এর প্রভাবের বিষয়টি নতুন নয়।

মার্কিন সামরিক সংবাদমাধ্যম Stars and Stripes জুলাই মাসে জানিয়েছিল, রণতরীটি টানা ২০৭ দিন সমুদ্রে অবস্থান করে যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরীগুলোর মধ্যে দীর্ঘতম ধারাবাহিক সমুদ্রযাত্রার একটি রেকর্ড গড়ে। তখন প্রায় ৫ হাজার সদস্যের ক্রু নিয়ে জাহাজটি মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্ব পালন করছিল।  

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, রণতরীটির দীর্ঘ সময়ের অপারেশনাল চাপ নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলছিল। পরিবারের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং বিশ্রামের স্বল্পতা নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছিলেন কয়েকজন নাবিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা।  

একজন নাবিক পরিবারের সদস্যদের কাছে বার্তায় তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সাহায্যের প্রয়োজনের কথা জানিয়েছিলেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, নাবিকদের মধ্যে ক্লান্তির বিষয়টি স্বীকার করা হলেও তারা দায়িত্ব পালনে নিজেদের সক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন।  

২০৮ দিন টানা সমুদ্রে

মেহর নিউজের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আব্রাহাম লিংকন মোট ২৬৩ দিন ধরে মোতায়েন রয়েছে এবং এর মধ্যে ২০৮ দিন টানা সমুদ্রে ছিল।  

তবে এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জুলাইয়ের Stars and Stripes প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, রণতরীটি ২০৭ দিন টানা সমুদ্রে থাকার পর একটি বন্দরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। অর্থাৎ বিভিন্ন প্রতিবেদনে গণনার তারিখ ও পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে।  

পরিবারের উদ্বেগ

আব্রাহাম লিংকনের ক্রুদের পরিবারের সদস্যরা সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজের দীর্ঘ মোতায়েন নিয়ে আরও সরব হয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে খাবার, ব্যক্তিগত ব্যবহারের সামগ্রী, গোসলের ব্যবস্থা, লন্ড্রি ও বিশ্রামের সুযোগ নিয়ে অভিযোগের কথা উঠে এসেছে।

১১ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিবারের সদস্যরা জাহাজে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সরবরাহের ঘাটতি এবং খারাপ জীবনযাত্রার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।  

রণতরীটির সামরিক গুরুত্ব

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন (CVN-72) যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর নিমিটজ শ্রেণির পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী। এতে হাজার হাজার নাবিক ও মেরিন সদস্য এবং বিপুলসংখ্যক যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার পরিচালিত হয়।

২০২৫ সালের নভেম্বরে সান দিয়েগো থেকে যাত্রা করার পর রণতরীটি প্রথমে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করে। পরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতায় আনা হয়। জানুয়ারির শেষ দিকে রণতরীটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছায়।  

ফেব্রুয়ারিতে রণতরীটির বিমানবহর ইরানসংক্রান্ত মার্কিন সামরিক অভিযানে অংশ নেয়। মার্কিন সামরিক সূত্রগুলোও জানিয়েছে, আব্রাহাম লিংকন দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে অপারেশন পরিচালনা করছে।  

ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য

ইরানি প্রতিবেদনে যাঁর উপদেষ্টার কথা বলা হয়েছে, তিনি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারিতে কুপার নিজেই আব্রাহাম লিংকনে গিয়ে ক্রুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং তাদের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রশংসা করেছিলেন।  

তবে মেহর-তাসনিমের প্রতিবেদনে বর্ণিত সাম্প্রতিক সংঘর্ষের সময় কুপারের ওই উপদেষ্টা ঠিক কী উদ্দেশ্যে জাহাজে গিয়েছিলেন এবং সেখানে কী ঘটেছিল—এ বিষয়ে মার্কিন পক্ষের কোনো স্বাধীন বিবরণ এখনো পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ মোতায়েন, টানা ২০০ দিনের বেশি সমুদ্রে অবস্থান এবং ক্রুদের মানসিক ও শারীরিক চাপের বিষয়টি মার্কিন সামরিক সংবাদমাধ্যম ও অন্যান্য প্রতিবেদনে আগেই উঠে এসেছে।  

সর্বশেষ অবস্থান: ইরানি সূত্রে সাতজন নিহত ও কয়েকজন আহত হওয়ার দাবি রয়েছে; কিন্তু মার্কিন নৌবাহিনী বা নির্ভরযোগ্য স্বাধীন কোনো সূত্র থেকে এখনো এ দাবির নিশ্চিত সমর্থন পাওয়া যায়নি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ