প্রকাশিত: মার্চ ৬, ২০২৬, ১০:৪৬ পিএম
ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা শুরুর পর আজ শুক্রবার (৬ মার্চ) সপ্তম দিনের যুদ্ধ চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে তার ও তেল আবিবের এই চরম বেআইনি আগ্রাসী যুদ্ধের মাধ্যমে আসলে কী হাসিল করতে চান, তা অন্তত তার দেওয়া যুক্তিগুলো থেকে বোঝা প্রায় অসম্ভব।
এটা কি ইরানের সেই পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করার জন্য, যার কোনো বাস্তব প্রমাণ কখনও মেলেনি? অথচ কয়েক মাস আগেই ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে একটি আইনবহির্ভূত হামলার মাধ্যমে তিনি সেটি ‘সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন’ করে দিয়েছেন।
নাকি এর উদ্দেশ্য হলো তেহরানকে তাদের পারমাণবিক শক্তি সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে পুনরায় আলোচনায় বসতে বাধ্য করা? যে আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রের উস্কানিমূলক হামলার কারণে অসময়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই আলোচনার প্রয়োজনই পড়েছিল, কারণ ২০১৮ সালে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ইরানের সঙ্গে করা মূল চুক্তিটি ছিঁড়ে ফেলেছিলেন।
অথবা এই যুদ্ধের লক্ষ্য কি ইরানকে নমনীয় হতে বাধ্য করা? যদিও ট্রাম্প ঠিক সেই মুহূর্তে আলোচনা ভেস্তে দিয়েছিলেন যখন প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমান জোর দিয়ে বলেছিল যে, তেহরান ওয়াশিংটনের প্রায় সব কঠিন শর্ত মেনে নিয়েছে এবং একটি চুক্তি ‘হাতের নাগালে’ ছিল।
নাকি এই বিমান হামলাগুলোর উদ্দেশ্য ইরানিদের ‘মুক্ত’ করা? যদিও এর প্রাথমিক শিকার হয়েছে একটি বালিকা বিদ্যালয়ের অন্তত ১৬৫টি শিশু, যাদের অধিকাংশই ছিল ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী।
নাকি এর লক্ষ্য ইরানকে তাদের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ত্যাগ করতে বাধ্য করা—যা তাদের আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষার একমাত্র উপায়। যা ছাড়া তারা মার্কিন ও ইসরাইলি অশুভ পরিকল্পনার মুখে সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়বে?
নাকি ওয়াশিংটন বিশ্বাস করেছিল যে তেহরান প্রথমে আক্রমণ করতে যাচ্ছে? যদিও পেন্টাগন কর্মকর্তারা কংগ্রেসের কাছে স্বীকার করেছেন যে, কোনো হামলার আশঙ্কা রয়েছে- এমন কোনো গোয়েন্দা তথ্য তাদের কাছে ছিল না।
অথবা লক্ষ্য কি ইরানি শাসনের শীর্ষ নেতৃত্বকে খতম করা, যা ইতোমধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে?
যদি তাই হয়, তবে এর উদ্দেশ্য কী, যেখানে খামেনি পারমাণবিক বোমার এতটাই বিরোধী ছিলেন যে তিনি এর তৈরির বিরুদ্ধে একটি ধর্মীয় ফতোয়া জারি করেছিলেন?
খামেনির উত্তরসূরি কি এখন—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কতটা অবিশ্বাস্য এবং তারা কীভাবে আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে একটি `দুর্বৃত্ত রাষ্ট্রে`র মতো আচরণ করে তা দেখার পর—ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পারমাণবিক বোমা তৈরিকে একটি পরম অগ্রাধিকার হিসেবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?
কোনো স্পষ্ট যৌক্তিকতা নেই
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট যৌক্তিকতা নেই, কারণ এই হামলার পরিকল্পনাকারী হোয়াইট হাউস বা পেন্টাগন নয়। এই পরিকল্পনা কয়েক দশক আগে তেল আবিবে তৈরি করা হয়েছে।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত রোববার এটি স্বীকারও করেছেন। তিনি দম্ভভরে বলেন, এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা আমাদের সেই কাজটি করার সুযোগ করে দিচ্ছে, যা আমি ৪০ বছর ধরে অর্জনের আশা করেছি, ‘সন্ত্রাসী শাসনকে’ পুরোপুরি চূর্ণ করা। এটাই আমার প্রতিশ্রুতি ও এটাই ঘটতে যাচ্ছে।
এই চার দশক ধরে নেতানিয়াহু ও অন্য ইসরাইলি নেতারা ক্রমাগত সতর্কবার্তা দিয়ে এসেছেন যে তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরির থেকে মাত্র কয়েক মাস দূরে রয়েছে।
নেতানিয়াহু এই একই জরুরি ও অর্থহীন অজুহাত ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলার পথ প্রশস্ত করার চেষ্টা করছেন। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে প্রতি বছরই প্রচার করা হয়েছে যে, ‘উন্মাদ মোল্লাদের’ বোমা পাওয়া থেকে বিরত রাখার এটিই শেষ সুযোগ—এমন এক বোমা যা কখনোই বাস্তবে দেখা যায়নি।
অথচ এই পুরো সময় জুড়ে ইসরাইলের নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার—যা অঘোষিত ও সেই কারণে অনিরীক্ষিত—সবারই জানা ছিল।
ইউরোপ ইসরাইলকে তাদের বোমা তৈরিতে সাহায্য করেছে, আর যুক্তরাষ্ট্র চোখ বন্ধ করে রেখেছে; এমনকি যখন ইসরাইলি নেতারা ‘সামসন অপশন’ নামক একটি আত্মঘাতী মতবাদ সমর্থন করেন। এই মতবাদ অনুযায়ী, প্রচলিত সামরিক পরাজয় বরণের চেয়ে ইসরাইল ও তাদের পারমাণবিক ভাণ্ডারের বিস্ফোরণ ঘটাবে।
সামসন অপশন পরোক্ষভাবে এই ধারণা পোষণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো রাষ্ট্রকে বোমা অর্জন করতে দেওয়া যাবে না, যাতে ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় থাকে।
এই ধারণাই কয়েক দশক ধরে তেহরানের প্রতি ইসরাইলি নীতিকে পরিচালিত করেছে। এর কারণ এই নয় যে ইরান অস্ত্র তৈরির ইচ্ছা দেখিয়েছে বা তাদের তথাকথিত ‘উন্মাদ মোল্লারা’ যদি কখনও বোমা পায় তবে তা ইসরাইলে নিক্ষেপ করার মতো বোকামি করবে।
না, কারণগুলো ছিল ভিন্ন। কারণ, ইরান এ অঞ্চলের বৃহত্তম ও সবচেয়ে ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র, যার আছে সমৃদ্ধ ইতিহাস, শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং এক বিশাল মেধাভিত্তিক ঐতিহ্য। কারণ, ইরান বারবার দেখিয়েছে যে—ধর্মনিরপেক্ষ বা ধর্মীয় যা-ই হোক না কেন—তারা পশ্চিমা ও ইসরাইলি ঔপনিবেশিক আধিপত্য মানতে নারাজ।
কারণ, প্রতিবেশী দেশগুলোর—ইরাক, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন—শিয়া ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো ইরানকে কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের উৎস হিসেবে দেখে, যাদের ইতিহাসও ইসরাইলি আধিপত্যের কাছে মাথা নত না করার।
ইসরাইলের ভয় ছিল যে, ইরান যদি উত্তর কোরিয়ার পথ অনুসরণ করে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তবে তেল-সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমাদের সবচেয়ে দরকারী সামরিক মিত্র হিসেবে ইসরাইলের গুরুত্ব শেষ হয়ে যাবে।
প্রতিবেশীদের আতঙ্কিত করা, সাম্প্রদায়িক বিভাজন উস্কে দেওয়া এবং এই অঞ্চলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্রদর্শনে সহায়তা করার ক্ষমতা হারালে ইসরাইল তার যৌক্তিকতা হারাবে। এটি তখন এক বিশাল দায় হয়ে দাঁড়াবে।
মার্কিন করদাতাদের টাকায় দেওয়া অফুরন্ত সামরিক ভর্তুকিতে তুষ্ট এবং ফিলিস্তিনিদের সম্পদ লুণ্ঠনের লাইসেন্স পাওয়া ইসরাইলি নেতারা কখনোই স্বেচ্ছায় তাদের এই সুযোগের পথ ছাড়তে চাইবেন না।
আর এই কারণেই ইরান কখনোই ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুর বাইরে ছিল না।
প্রসব বেদনা
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের স্বপক্ষে ইসরাইল যে অসাধারণ প্রতারণার জাল বুনেছে, তার গভীরতা বোঝা যায় ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের চালানো জালিয়াতির সঙ্গে তুলনা করলে।
ইরাক ছিল আরেকটি শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্র—যদিও গভীর সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত বিভাজনের কারণে তা কিছুটা ভঙ্গুর ছিল—যাকে ইসরাইল ভয় পেত এই কারণে যে তারা পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করলে এ অঞ্চলে ইসরাইলের একাধিপত্য নষ্ট হবে।
সেই অবৈধ যুদ্ধের প্রস্তুতির সময়—যা আবারও ইসরাইল উৎসাহিত করেছিল—বুশ দাবি করেছিলেন যে ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেনের কাছে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্রের বিশাল ও গোপন মজুদ রয়েছে।
তদন্তকারীরা, যারা ইরাকে ব্যাপক ক্ষমতা ভোগ করতেন, জানিয়েছিলেন যে এমন মজুদ থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তারা আরও উল্লেখ করেছিলেন যে, যদি ইরাকের জানা কিছু রাসায়নিক অস্ত্র তাদের নজর এড়িয়েও গিয়ে থাকে, তবে সেগুলো এত পুরনো হয়ে গেছে যে এতদিনে তা ‘ক্ষতিকারক নয় এমন কাদার স্তূপে’ পরিণত হওয়ার কথা।
ইরাক আক্রমণের পর সেখানে কোনো ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও, পশ্চিমা রাজনীতিবিদ এবং গণমাধ্যম এই বিশাল মিথ্যাকে অনায়াসেই লুফে নিয়েছিল। অন্তত সেই সময় তারা দাবি করতে পারতেন যে, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করার জন্য তাদের হাতে মাত্র কয়েক মাস সময় ছিল।
কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে, রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যম ইসরাইলের দাবির গ্রহণযোগ্যতা যাচাই ও তদন্ত করার জন্য দীর্ঘ ৪০ বছর সময় পেয়েছে। অনেক আগেই তাদের বোঝা উচিত ছিল যে, তথাকথিত ইরানি ‘হুমকি’ নিয়ে নেতানিয়াহু একজন সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য বর্ণনাকারী।
তাছাড়া এটিও মাথায় রাখা দরকার যে, তিনি একজন পলাতক যুদ্ধাপরাধী সন্দেহভাজন, যিনি গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে গাজায় ইসরাইলের চালানো গণহত্যামূলক ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে অনবরত মিথ্যাচার করে আসছেন। তার মুখ থেকে বের হওয়া একটি শব্দও কারও বিশ্বাস করা উচিত নয়।
গাজার বর্তমান নির্মূল অভিযান এবং তার আগে ইরাক দখলের মতো, ইরানের ওপর বর্তমান হামলাটিও মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের একটি অংশ—প্রকৃতপক্ষে, এটি একই প্রকল্পের ধারাবাহিকতা।
এই যুদ্ধের প্রচারণার ধরন একদম স্পষ্ট
নেতানিয়াহু ‘সন্ত্রাসী শাসনকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার’ কথা বলছেন, ঠিক যেমনটি তিনি এর আগে গাজায় হামাসকে ‘নির্মূল’ করার বিষয়ে বলেছিলেন।
একইভাবে ট্রাম্প দাবি করেছেন যে একটি পরাজিত ইরান হলো ‘সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মধ্যপ্রাচ্যের’ চাবিকাঠি। সপ্তাহান্তে বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর তিনি ইরানিদের প্রতি তাদের ‘নিপীড়নমূলক ধর্মতন্ত্র’ উৎখাত করে একটি ‘মুক্ত ও শান্তিপূর্ণ’ দেশ গড়ার আহ্বান জানান।
এই সবকিছুর নকশা করা হয়েছে একটি ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ গড়ে তোলার সেই কাল্পনিক পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে, যা ইসরাইল এবং ওয়াশিংটনে তাদের আদর্শিক প্রতিনিধিরা—যারা নব্য-রক্ষণশীল বা `নিওকন` নামে পরিচিত—বিগত সোয়া একশ বছর ধরে প্রচার করে আসছে; এমনকি আফগানিস্তান ও ইরাকে ব্যর্থ অভিযানের আগে থেকেই।
২০০৬ সালে বুশ প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইস এক ‘যন্ত্রণাদায়ক প্রসব বেদনা’ সম্পর্কে বলেছিলেন, যা এই অঞ্চলকে সহ্য করতে হবে, যখন মার্কিন ও ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এই নতুন যুগের `ধাত্রী` হিসেবে কাজ করবে।
প্রথম দফায় পরিকল্পনাটি দ্রুতই ব্যর্থ হয়। মার্কিন সেনারা ইরাকিদের তীব্র প্রতিরোধ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আফগানিস্তান ধীরে ধীরে মার্কিন ও ব্রিটিশ দখলদারদের হাত থেকে তালেবানরা পুনরুদ্ধার করে। আর ২০০৬ সালে দক্ষিণ লেবানন পুনরায় দখলের চেষ্টা করতে গিয়ে হিজবুল্লাহর কাছে ইসরাইল কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়।
তা সত্ত্বেও, প্রথম দফার সেই সময়কালটি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। এর ফলে এ অঞ্চল জুড়ে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিশেষ গোপন আস্তানা তৈরি করা হয়, যেখানে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘিত হয়। যুদ্ধের কারণে লাখ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতি তাদের ইউরোপের দিকে ধাবিত করে, যা সেখানে অভিবাসন-বিরোধী কট্টর ডানপন্থীদের উত্থানকে উসকে দেয়।
শাসন পরিবর্তনের ধারণা
দ্বিতীয় দফা—যা শুরু করার জন্য ইসরাইল এবং নিওকনরা দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষায় ছিল—তা সব সময়ই আরও বেশি ভয়াবহ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
সেই মুহূর্তটি আসে ২০২৩ সালের শেষদিকে, যখন হামাস গাজা থেকে একটি মারাত্মক অভিযান চালায়—যেখানে প্রায় ২৩ লাখ ফিলিস্তিনি কয়েক দশক ধরে অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিল।
‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার কথা বলে ইসরাইল নির্বিচার বিমান হামলা শুরু করে। ক্ষুদ্র এই উপকূলীয় এলাকাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত হয় এবং সমগ্র জনগোষ্ঠী গৃহহীন ও নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
তবে এই ধ্বংসযজ্ঞ—ঠিক যেমন গাজার মানুষকে অনাহারে রাখার ইসরাইলি পদক্ষেপ—তা কেবল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার প্রতিক্রিয়া ছিল না, যদিও এর বাইরে অন্য কিছু বলা এক প্রকার নিষিদ্ধ ছিল।
মধ্যপ্রাচ্যকে ‘নতুন করে সাজানোর’ জন্য ইসরাইলের পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের, যা নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় আসারও আগের।
রূপান্তরিত মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়ে ইসরাইলের এই ছক ওয়াশিংটনের পরিকল্পনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা এখনও অস্পষ্ট, যদিও বিশ্লেষকরা সাধারণত উভয়কেই ‘শাসন পরিবর্তন’ হিসেবে অভিহিত করেন। কিন্তু শব্দটি এখানে যথার্থ নয়। এমনকি ওয়াশিংটনের কাছেও শাসন পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে তারা ইরানি জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায় এমন কোনো গণতান্ত্রিক নেতাকে ক্ষমতায় বসাবে।
ইরাকে দায়িত্ব পালন করা বর্তমান মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ তার সাম্প্রতিক পূর্বসূরিদের তুলনায় অনেক বেশি সৎ ছিলেন যখন তিনি ধারণাটি উড়িয়ে দেন যে, এই অবৈধ হামলা থেকে কল্যাণকর কিছু বেরিয়ে আসবে।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘লড়াইয়ের কোনো বোকা নিয়ম থাকবে না, কোনো দেশ গড়ার ঝক্কি নেই, গণতন্ত্র তৈরির অনুশীলন নেই, আর তথাকথিত `রাজনৈতিকভাবে সঠিক` কোনো যুদ্ধও নয়।"
এই অনীহার পেছনে ভালো কারণও আছে। ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে ইরানে যখন শেষবার একটি গণতান্ত্রিক সরকার ছিল, তখন তার ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ইরানিদের স্বার্থে দেশটির তেল শিল্প জাতীয়করণ করে পশ্চিমাপন্থীদের ক্ষুব্ধ করেছিলেন।
১৯৫৩ সালে সিআইএর `অপারেশন এজাক্স` তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং নিষ্ঠুর মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে রাজতন্ত্র বা `শাহ` হিসেবে পুনর্প্রতিষ্ঠিত করে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনকে ইরানের তেলের ওপর পুনরায় নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।
এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া আসতে সময় লেগেছিল ২৬ বছর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সমর্থিত শাহের প্রতি জনগণের পুঞ্জীভূত ঘৃণা কাজে লাগিয়ে ইসলামি আলেমরা বিপ্লব শুরু করেন।
উন্মাদ সংখ্যালঘু
ওয়াশিংটন নিঃসন্দেহে ‘শাসন পরিবর্তন’ হিসেবে শাহের বড় ছেলে রেজা পাহলভিকে একজন নতুন স্বৈরাচারী ও পশ্চিমা পুতুল হিসেবে ক্ষমতায় বসাতে চাইবে। ইসরাইলও হয়তো এমন সিদ্ধান্তে খুশি হবে।
কিন্তু ওয়াশিংটন বা তেল আবিব—উভয় পক্ষের কেউই আসলে মনে করে না যে, বোমা মেরে ইরানকে শাহের মতো কোনো নিষ্ঠুর অনুগত নেতাকে গ্রহণে বাধ্য করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত কেবল একটি প্রকাশ্য বিষয়ই প্রমাণ করতে পেরেছে; তা হলো, মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার নিষ্ঠুর যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ইরানি জনগণ যদি অসহনীয় দারিদ্র্যের শিকার হয়, তবে তাদের বড় অংশকে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নামানো সম্ভব—ঠিক যেমনটি গত ডিসেম্বরের শেষে দেখা গিয়েছিল।
তবে পশ্চিমা রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যমের ইঙ্গিত যাই হোক না কেন, চরম দারিদ্র্যে ক্ষুব্ধ এই ইরানিরা কোনো সুসংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। তারা সেই সব মার্কিন অভিজাতদের অনুরোধেও সাড়া দেবে না যারা বছরের পর বছর ধরে তাদের দেশটিকে দেউলিয়া করে চলেছে।
যদি মনে হয় যে ইরানের বিরোধী দল ক্ষমতা দখলের জন্য প্রস্তুত, তবে তার কারণ পশ্চিমা মিডিয়া দর্শকদের দুটি মিথ্যা তথ্যে অভ্যস্ত করে তুলেছে। প্রথমত, ইরানি সরকারের কোনো জনসমর্থন নেই। দ্বিতীয়ত, বিক্ষোভকারীরা তাদের দুর্দশার জন্য কেবল নিজেদের শাসকদের দায়ী করছে এবং তাদের জীবনে অশুভ হস্তক্ষেপকারী বাইরের দেশগুলোর প্রতি কোনো ঘৃণা পোষণ করছে না।
কয়েকজন ধনী প্রবাসী ইরানি—যারা পশ্চিমা ঔপনিবেশিক প্রভুদের কাছে ইরানের সম্পদ বেঁচে আবারও লাভবান হতে চান—হয়তো পশ্চিমা টিভি স্টুডিওর নিরাপদ আশ্রয়ে বসে ইরানি স্কুলছাত্রদের ওপর বোমাবর্ষণকে সমর্থন দিতে পারেন। কিন্তু তারা যে একটি ক্ষুদ্র ও উন্মাদ সংখ্যালঘু গোষ্ঠী ছাড়া আর কিছুই নয়, তা না বোঝা হবে বোকামি।
মাগা শিবিরে অস্থিরতা
মার্কিন জনগণকে শান্ত রাখার প্রয়োজনীয়তা থেকে ওয়াশিংটনে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তার বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যকে ‘নতুন করে সাজানোর’ বিষয়ে ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।
তেল আবিবের কাছে ‘শাসন পরিবর্তনের’ কোনো গুরুত্ব নেই, যদি না নতুন শাসনব্যবস্থা উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো আঞ্চলিক অধিপতি হিসেবে ইসরাইলের কাছে নতি স্বীকার করতে রাজি হয়।
এমন কোনো সম্ভাবনা না থাকায়, ইসরাইল যা চায় তাকে বরং ‘শাসনব্যবস্থা উৎখাত’ বা ‘শাসনব্যবস্থার পতন’ বলা ভালো: যার অর্থ ইরানের অবকাঠামোর পাইকারি ধ্বংসযজ্ঞ, সমস্ত সরকারি ও সামরিক কর্তৃত্বের বিলুপ্তি এবং এমন একটি ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি করা যেখানে ইসরাইল প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবং একটি স্থায়ী ও ক্ষয়িষ্ণু গৃহযুদ্ধ উসকে দিতে পারবে।
শুনে কি পরিচিত মনে হচ্ছে
এর কারণ হলো, ইরানের ওপর এই হামলা ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া এবং ইয়েমেনে হামলার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের ইসরাইলি `নিওকন` মিত্রদের দ্বারা ব্যবহৃত একই বিপর্যয়কর মার্কিন সামরিক কৌশলের সাথে মিলে যায়।
ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছিলেন মূলত এই কারণেই যে, তিনি এই ‘অন্তহীন যুদ্ধগুলো’—যা মূলত ইসরাইলের জন্য যুদ্ধ—বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; যে যুদ্ধগুলো পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে এবং আল-কায়েদা থেকে ইসলামিক স্টেট পর্যন্ত নতুন ধরনের জঙ্গি ইসলামি চরমপন্থাকে সরাসরি ইন্ধন দিয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই, ইরানের ওপর হামলার কারণে তার `মাগা` আন্দোলন এখন চরম অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে।
কিন্তু ট্রাম্প, যিনি নির্বাচনি ভোটের জন্য উগ্র ইসরাইল-পন্থী খ্রিস্টান ইভানজেলিকালদের ওপর এবং আর্থিক সহায়তার জন্য মিরিয়াম অ্যাডেলসনের মতো বড় ইসরাইলি দাতাদের ওপর নির্ভরশীল, তিনি কখনোই প্রচলিত ছকের বাইরে যাওয়ার সাহস দেখাননি।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে বাইডেন প্রশাসনের সমর্থনে ইসরাইল গাজা, লেবানন এবং আবারও সিরিয়ায় তাদের ‘শাসন উৎখাত’ যুদ্ধগুলো ছড়িয়ে দিয়েছে। এর সব দেশই এখন সামরিকভাবে পঙ্গু এবং শাসন করার মতো প্রায় অযোগ্য।
ট্রাম্প এসব যুদ্ধের বিরোধিতা করেননি—এবং সেগুলোর প্রাথমিক উদ্দেশ্যই ছিল ইরানকে তার আঞ্চলিক মিত্রদের থেকে বিচ্ছিন্ন করার পথ প্রশস্ত করা, যাতে বর্তমান হামলার জন্য ইরানকে যথেষ্ট অরক্ষিত অবস্থায় ফেলা যায়।
ফোর-স্টার জেনারেল ওয়েসলি ক্লার্ক ২০০৭ সালে যা স্বীকার করেছিলেন, এটি সেই সম্পূর্ণ অনুমেয় চিত্রনাট্যই অনুসরণ করেছে। ২০০১ সালের টুইন টাওয়ার হামলার কিছু পরেই তাকে পেন্টাগনের একটি গোপন ব্রিফিং পেপার দেখানো হয়েছিল, যেখানে ইরাক থেকে শুরু করে ইরান পর্যন্ত সাতটি দেশকে ‘খতম’ করার পরিকল্পনা ছিল।
শয়তানের সঙ্গে চুক্তি
ওয়াশিংটনের পশ্চিমা মিত্ররা হয়তো দৃশ্যত আরেকটি অবৈধ মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হতে ব্যক্তিগতভাবে অস্বস্তি বোধ করছে। কিন্তু গাজায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা গণহত্যাকে সমর্থন করে তারা ইতোমধ্যেই শয়তানের সঙ্গে চুক্তি করে ফেলেছে। এখন আর ফিরে যাওয়ার পথ নেই।
আর এই কারণেই ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া—সবাই এই সপ্তাহে বাধ্যগতভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের পেছনে সারিবদ্ধ হয়েছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল জানুয়ারিতে দাভোসে দেওয়া নিজের বক্তব্যই গিলে ফেলা। তিনি বলেছিলেন যে, তার মতো ‘মধ্যম শক্তিগুলোর’ উচিত মার্কিন নেতৃত্বাধীন লোক দেখানো পরোপকারের ‘মিথ্যার মধ্যে বাস করা’ বন্ধ করা এবং একটি সৎ পররাষ্ট্রনীতি এগিয়ে নিতে নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
অথচ কার্নি সপ্তাহান্তে একটি বিবৃতি দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চরম বেআইনি আগ্রাসী যুদ্ধের প্রতি কানাডার পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন—যাকে আন্তর্জাতিক আইন ‘সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। যদিও পরে অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়ার মুখে তাকে পিছু হটতে হয়েছে।
অন্যদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার তথাকথিত ‘প্রতিরক্ষামূলক উদ্দেশে’ ব্যবহারের জন্য ট্রাম্পের হাতে যুক্তরাজ্যের বিমানঘাঁটিগুলোর চাবি তুলে দিয়েছেন।
স্টারমার, যিনি একসময় বিখ্যাত মানবাধিকার আইনজীবী ছিলেন, তাকে কেউ একজন বোঝানো দরকার যে আপনি কোনো ‘আগ্রাসী যুদ্ধে’ প্রতিরক্ষামূলকভাবে সহায়তা করতে পারেন না। এটি করার মাধ্যমে আপনি নিজেও একজন আক্রমণকারী হয়ে ওঠেন।
জেনারেল ক্লার্ক পেন্টাগনের ২০০১ সালের যে পরিকল্পনাটি দেখেছিলেন, তার সময়সীমা ছিল ‘পাঁচ বছরে সাতটি দেশ’। সিকি শতাব্দী পরে বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করেছে যে, সেই পরিকল্পনাটি ছিল চরম অবাস্তব।
২০০১ সালের তুলনায় এখন মার্কিন বা ইসরাইল এই যুদ্ধের পরিণতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা রাখে—এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। একমাত্র নিশ্চিত বিষয় হলো, এটি পরিকল্পনা অনুযায়ী চলবে না।
ইসরাইল মানচিত্র থেকে ক্ষুদ্র গাজাকে মুছে ফেলেছে, কিন্তু হামাস এখনও টিকে আছে এবং ধ্বংসস্তূপের নিয়ন্ত্রণ করছে; নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে প্রতিশোধের আগুন এখন আরও তীব্রভাবে জ্বলছে।
ইরান গাজা বা ইসরাইল-মার্কিন হামলার আগের লক্ষ্যবস্তুগুলোর তুলনায় অনেক বিশাল এক শক্তির নাম।
প্রতিরোধের আগুন—গাজা, ইরাক, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও সম্ভবত বাহরাইনের মতো নতুন জায়গাগুলোতে—এখনও নিভে যায়নি। আর এখন ইরানের ওপর হামলার মাধ্যমে, সব নতুন অপরাধ ও নৃশংসতার সঙ্গে সেই আগুনে নতুন করে বাতাস দেওয়া হচ্ছে।