প্রকাশিত: মে ১, ২০২৬, ১১:১৮ এএম
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে—জিডিপি বেড়েছে, রপ্তানি সম্প্রসারিত হয়েছে, মাথাপিছু আয় উন্নীত হয়েছে নিম্নমধ্যম আয়ের পর্যায়ে। কিন্তু এই উন্নয়নের ভিত্তি যে শ্রমিকশ্রেণি, তাদের বাস্তবতা এখনো কঠিন ও অনিশ্চিত। অর্থনীতির সাফল্যের গল্প যত উজ্জ্বল, শ্রমিকের জীবন ততটাই বৈপরীত্যে ভরা।
কম মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সামাজিক সুরক্ষার অভাব—এসব সমস্যাই শ্রমিকের নিত্যসঙ্গী। দেশে এখনো বহু খাতে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হয়নি, আর যেসব খাতে আছে, সেখানেও দীর্ঘদিন ধরে মজুরি সমন্বয় হয়নি। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপে প্রকৃত আয় ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। যখন পণ্যমূল্য বৃদ্ধির হার মজুরি বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যায়, তখন উন্নয়ন পরিসংখ্যানের সব অর্জনই সাধারণ মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির তিন প্রধান স্তম্ভ—কৃষি, তৈরি পোশাক এবং প্রবাসী আয়—মূলত সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। এই “সস্তা শ্রম”কে বিনিয়োগ আকর্ষণের হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, বাস্তবে এটি শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নকে আড়াল করে রেখেছে। শ্রমিকরা অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখছেন, কিন্তু সেই অর্থনীতির সুফল তাদের জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে না—এ এক গভীর বৈষম্যের চিত্র।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বৈশ্বিক অস্থিরতা ও যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক চাপ। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং দারিদ্র্যের বিস্তার—সব মিলিয়ে শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। ফলে বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
এ বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সমাধান কোথায়? শ্রমিকবান্ধব নীতির অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। জাতীয় মজুরি কমিশন গঠন, খাতভিত্তিক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনা, শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্য, আবাসন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এসব বিষয় এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং জরুরি প্রয়োজন। পাশাপাশি শ্রম আইনকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।
মালিকপক্ষের উদ্যোগ ও বক্তব্য অবশ্য ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে। শ্রমিক কল্যাণ তহবিল, স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি প্রশংসনীয়। তবে এগুলো এখনো সীমিত পরিসরে। বৃহৎ শ্রমশক্তির তুলনায় এই উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাষ্ট্র, মালিক ও শ্রমিক—তিন পক্ষের সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ।
সবশেষে বলা যায়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল সমাজের সব স্তরে পৌঁছায়। শ্রমিকদের বাদ রেখে কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। তাই সময় এসেছে—পরিসংখ্যানের উন্নয়ন নয়, বাস্তব জীবনের উন্নয়ন নিশ্চিত করার। শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী অগ্রযাত্রার প্রকৃত সূচক।