• ঢাকা মঙ্গলবার
    ১৪ জুলাই, ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩

গায়ের রং নয়, জার্সির প্রতি দায়বদ্ধতাই একজন ফুটবলারের পরিচয়

প্রকাশিত: জুলাই ১৪, ২০২৬, ০৯:২৫ পিএম

গায়ের রং নয়, জার্সির প্রতি দায়বদ্ধতাই একজন ফুটবলারের পরিচয়

সৈয়দ আতিক

বিশ্বকাপের মতো সর্বজনীন ক্রীড়া আসর কেবল শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়; এটি বৈচিত্র্যের উদ্‌যাপনও। ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের মানুষ যখন একটি বলের পেছনে একই আবেগে একত্রিত হয়, তখন ফুটবল তার প্রকৃত শক্তির পরিচয় দেয়। এই কারণেই বিশ্বকাপকে প্রায়ই বলা হয় মানবতার সবচেয়ে বড় মিলনমেলা। অথচ এমন এক সময়ে, বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের আগে স্পেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাজয়ের বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য কেবল একটি দলের বিরুদ্ধে নয়, আধুনিক ফুটবলের মৌলিক দর্শনের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে।

ফ্রান্স জাতীয় দলে “কতজন প্রকৃত ফরাসি” আছেন—এ প্রশ্ন গায়ের রঙ দেখে নির্ধারণ করা যায় বলে মন্তব্য করেছেন রাজয়। এই বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; এটি এমন এক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ, যা নাগরিক পরিচয়কে রক্ত, বর্ণ ও ত্বকের রঙের সংকীর্ণ মানদণ্ডে আবদ্ধ করতে চায়। অথচ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে সমঅধিকার, নাগরিকত্ব এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতির ওপর। একজন নাগরিকের পরিচয় তার ত্বকের রঙে নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতি তার অধিকার ও দায়িত্বে।

এমন প্রেক্ষাপটে স্পেনের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালের প্রতিক্রিয়া কেবল একটি জবাব নয়, বরং একটি মূল্যবোধের ঘোষণা। তিনি বলেছেন, ফুটবল মানুষকে একত্র করে; এখানে ধর্ম, বর্ণ কিংবা গায়ের রঙের কোনো গুরুত্ব নেই। একজন তরুণ ফুটবলারের কণ্ঠে এমন পরিণত বার্তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কারণ, তিনি জানেন বৈচিত্র্য কোনো দুর্বলতা নয়—এটাই আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় শক্তি।

ইয়ামালের ব্যক্তিগত জীবনও এই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মরক্কোয় জন্ম নেওয়া বাবার এবং গিনির বংশোদ্ভূত মায়ের সন্তান হয়েও তিনি স্পেনের জার্সি গায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। একইভাবে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস কিংবা বেলজিয়ামের জাতীয় দলেও রয়েছে নানা জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পটভূমির খেলোয়াড়। তারা সবাই নিজ নিজ দেশের নাগরিক, জাতীয় সংগীত গেয়ে মাঠে নামেন এবং দেশের সাফল্যের জন্য নিজেদের সর্বোচ্চ উজাড় করে দেন। তাদের দেশপ্রেমকে গায়ের রঙ দিয়ে বিচার করার কোনো নৈতিক বা যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি নেই।

আসলে অভিবাসন ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজ এখন আর ব্যতিক্রম নয়; এটি বিশ্বায়নের বাস্তবতা। ইউরোপের অধিকাংশ দেশই বহু জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সম্মিলিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সেই সমাজের প্রতিফলনই দেখা যায় জাতীয় ফুটবল দলে। ফলে বহুজাতিক শিকড় থাকা কোনো খেলোয়াড়ের উপস্থিতি জাতীয় পরিচয়ের সংকট নয়; বরং একটি উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের প্রতিচ্ছবি।

ফুটবলের ইতিহাসও একই শিক্ষা দেয়। জিনেদিন জিদান, থিয়েরি অঁরি, প্যাট্রিক ভিয়েরা, কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা আরও অসংখ্য কিংবদন্তি ফুটবলার প্রমাণ করেছেন, প্রতিভার কোনো জাতিগত পরিচয় নেই। ইতিহাস কখনো তাদের গায়ের রঙ দিয়ে বিচার করেনি; বিচার করেছে তাদের অবদান, নেতৃত্ব এবং সাফল্যের মাধ্যমে। মাঠে গোলই শেষ কথা, বর্ণ নয়।

ফিফা দীর্ঘদিন ধরে “No Racism” নীতির মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। দর্শকের বর্ণবাদী আচরণ, খেলোয়াড়দের প্রতি বৈষম্যমূলক স্লোগান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণামূলক প্রচারণার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কারণ, ফুটবল যদি বিভাজনের ভাষা শেখায়, তবে এই খেলার সবচেয়ে বড় শক্তি—মানুষকে একত্র করার ক্ষমতা—নষ্ট হয়ে যাবে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক বক্তব্যে এখনও অভিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে বিভাজনের রাজনীতি দেখা যায়। জনপ্রিয়তার জন্য কিংবা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধার আশায় এমন বক্তব্য দেওয়া হলেও এর সামাজিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এটি ঘৃণা ও বৈষম্যের সংস্কৃতিকে উসকে দিতে পারে। ফলে জনজীবনে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বক্তব্য আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।

আজ স্পেন ও ফ্রান্স মাঠে নামবে বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে। সেখানে জয়ী হবে যে দল ভালো খেলবে, যার পরিকল্পনা ও মানসিক দৃঢ়তা বেশি কার্যকর হবে। ম্যাচের ফল নির্ধারণ করবে না কোনো খেলোয়াড়ের গায়ের রঙ, পারিবারিক শিকড় কিংবা ধর্মীয় পরিচয়। নির্ধারণ করবে দক্ষতা, শৃঙ্খলা, দলীয় সমন্বয় এবং জয়ের অদম্য ইচ্ছা।

বিশ্বকাপ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীর মানুষকে একত্র করার ক্ষমতা যদি কোনো ক্রীড়ার থাকে, তবে সেটি ফুটবল। তাই এই খেলার সবচেয়ে বড় বার্তা হওয়া উচিত বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা, সমতার প্রতি অঙ্গীকার এবং মানবিক মর্যাদার প্রতি অবিচল সম্মান। বিভাজনের রাজনীতি ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু মানবতার জয়ই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে টিকে থাকে।

ফুটবলের ভাষা একটাই—প্রতিভা, পরিশ্রম এবং ঐক্য। সেই ভাষাকে বর্ণবিদ্বেষের বিষে কলুষিত না করে, সম্মান ও সহাবস্থানের শক্তিতেই বিশ্ব ফুটবলকে আরও সমৃদ্ধ করা আজ সময়ের দাবি।

আর্কাইভ