প্রকাশিত: আগস্ট ১৩, ২০২৬, ১২:১৪ এএম
জ্বালানি সংকট ও তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কোনো কোনো এলাকায় প্রতিদিন ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনদুর্ভোগের পাশাপাশি বাড়ছে ক্ষোভ। এরই মধ্যে কয়েকটি এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
এ পরিস্থিতিতে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রিড, উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন (বাপবিএ)।

সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিটি বুধবার আইজিপির কাছে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে চিঠির অনুলিপি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের একান্ত সচিব, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) দেওয়া হয়েছে।
চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম: বাপবিএর চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে জ্বালানি সংকট ও তীব্র তাপদাহের কারণে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিড থেকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো প্রয়োজনের তুলনায় কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাচ্ছে।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, দেশের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর গড় চাহিদা বর্তমানে প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট। বিপরীতে তারা গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাচ্ছে। অর্থাৎ কোনো কোনো সময়ে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

এই ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
৫ কোটি ২০ লাখ গ্রাহকের বড় অংশ পল্লী বিদ্যুতের আওতায়: পল্লী বিদ্যুতের সংকটের প্রভাব কেন এত ব্যাপক, তার একটি বড় কারণ দেশের মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের বিশাল অংশ এই ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে।
বাপবিএ জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৪ কোটি গ্রাহককে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো বিদ্যুৎ সেবা দিয়ে থাকে। অর্থাৎ দেশের মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের প্রায় ৮০ শতাংশই পল্লী বিদ্যুতের আওতাভুক্ত।
তবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো নিজেরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যায়, সেটিই তাদের আওতাধীন গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ফলে উৎপাদন কমে গেলে এবং বরাদ্দ কমে গেলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে গ্রামাঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহে।
বাড়ছে জনরোষ: চিঠিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে। বিদ্যুৎ না থাকার জন্য অনেক সময় স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ও উপকেন্দ্রগুলোতেই মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।
ইতোমধ্যে কয়েকটি এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের উপকেন্দ্র ও অফিসে হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তাদের বক্তব্য, সরবরাহ সংকটের মূল কারণ উৎপাদন ও বরাদ্দের ঘাটতি হলেও মাঠপর্যায়ে গ্রাহকদের ক্ষোভের মুখে পড়ছেন স্থানীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ফলে উপকেন্দ্র ও অফিসে দায়িত্ব পালন করা কর্মীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলায় বাড়তে পারে সংকট: বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ও গ্রিড দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর অংশ। এসব স্থাপনায় হামলা বা ভাঙচুর হলে শুধু সংশ্লিষ্ট অফিসের কার্যক্রম ব্যাহত হয় না, বরং বড় একটি এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ফলে দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের ক্ষোভ থেকে যদি বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলার ঘটনা বাড়তে থাকে, তাহলে বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণেই দেশের প্রতিটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রিড, উপকেন্দ্র ও অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের জন্য স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে বাপবিএ।
সংকটের পেছনে জ্বালানি সরবরাহও বড় বিষয়: বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানিনির্ভর। প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন করা সম্ভব হয় না।ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থাপিত সক্ষমতা ও বাস্তবে উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়। চাহিদা বাড়ার সময়ে এই ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তীব্র গরমে ঘরে ঘরে ফ্যান, এসি, ফ্রিজসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। একই সময়ে উৎপাদন পর্যাপ্ত না থাকায় চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান সামাল দিতে লোডশেডিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলে ভোগান্তি বেশি: শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষিকাজ, সেচ, দোকানপাট ও স্থানীয় শিল্পকারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে।
সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ঘাটতি এখন শুধু বিদ্যুৎ বিভাগের ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি জনজীবন, অর্থনীতি এবং আইনশৃঙ্খলার ওপরও প্রভাব ফেলছে।
নিরাপত্তা জোরদারের দাবি: এ পরিস্থিতিতে পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন মনে করছে, বিদ্যুৎ সংকট যতদিন থাকবে, ততদিন গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ স্থাপনাগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা প্রয়োজন।
আইজিপির কাছে পাঠানো চিঠিতে প্রতিটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রিড, উপকেন্দ্র ও কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লোডশেডিং কমাতে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি সম্পর্কে গ্রাহকদের নিয়মিত ও স্পষ্ট তথ্য দেওয়া গেলে স্থানীয় পর্যায়ে ভুল বোঝাবুঝি ও ক্ষোভ কিছুটা কমানো সম্ভব।
কারণ বিদ্যুৎ সংকটের দায় মাঠপর্যায়ের বিতরণ কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বরং উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ, জাতীয় গ্রিড ও বিতরণ—পুরো ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে পরিচালনার মাধ্যমেই বর্তমান সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—জ্বালানি সরবরাহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি কত দ্রুত কমানো সম্ভব হবে। কারণ সংকট দীর্ঘ হলে শুধু লোডশেডিং নয়, গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।