প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২৬, ০৭:২১ পিএম
ইরানের বিমান হামলার জবাবে সৌদি আরব ও কাতারসহ প্রতিবেশী দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত।
তবে প্রতিবেশী দেশগুলো এই প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় চরম হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয় আবুধাবি। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে ব্লুমবার্গ নিউজ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যখন ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু করে, তার পরপরই সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ (এমবিজে) সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানসহ অঞ্চলের অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে একাধিক ফোনালাপ করেন।
গোপন এই আলোচনার বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সূত্রগুলো জানায়, এমবিজে বিশ্বাস করতেন যে ইরানকে প্রতিহত করতে উপসাগরীয় দেশগুলোর জোটবদ্ধ হয়ে পাল্টা আঘাত করা উচিত। কারণ, মার্কিন-ইসরাইলি হামলার জবাবে ইরান যখন উপসাগরীয় দেশগুলো লক্ষ্য করে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছিল, তখন আবুধাবি ছাড়াও পুরো অঞ্চলের বন্দর, বিমানবন্দর এবং আবাসিক এলাকাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।
এমনকি ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলো তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়, যা তাদের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত দ্রুত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এবং ইসরাইলের সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলেও, অন্য উপসাগরীয় দেশগুলো এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে। একটি সূত্রের মতে, রিয়াদ ও দোহার পক্ষ থেকে আবুধাবিকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয় যে—এটি তাদের যুদ্ধ নয়।
এই মতপার্থক্যের জের ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মধ্যকার আগে থেকে চলে আসা ভঙ্গুর সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে যায়। ফোনালাপের সময় আমিরাতের প্রেসিডেন্ট তার সমকক্ষদের মনে করিয়ে দেন যে ১৯৮১ সালে মূলত ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের হুমকি মোকাবিলা করতেই ছয় দেশের আঞ্চলিক জোট জিসিসি (উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ) গঠন করা হয়েছিল। তবে এই যুক্তিতেও বরফ গলেনি।
এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের জের ধরেই গত এপ্রিলের শেষের দিকে জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর শক্তিশালী জোট ওপেক ত্যাগ করার মতো ঐতিহাসিক ও আকস্মিক সিদ্ধান্ত নেয় আমিরাত। একই সঙ্গে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করে তারা।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থন ছাড়াই মার্চ ও এপ্রিল মাসে ইরানের বিরুদ্ধে সীমিত আকারে নিজস্ব হামলা চালায় আবুধাবি। বর্তমানে তারা জিসিসি-সহ অন্যান্য আঞ্চলিক সংস্থায় নিজেদের সদস্যপদ বজায় রাখার বিষয়টিও পুনর্বিবেচনা করছে। অবশ্য ইরান ইস্যু ছাড়াও সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ইয়েমেন ও সুদান সংকট নিয়ে মতবিরোধ চলছিল।
গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও, ২০২০ সালে অব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা সংযুক্ত আরব আমিরাত এই যুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যে পরিণত হয়।
যুদ্ধবিরতির আগে ইরান আমিরাত লক্ষ্য করে প্রায় ৩,০০০ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যার সিংহভাগই আমিরাতের বহুমাত্রিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। এমনকি সম্প্রতি ফুজিরাহ তেল বন্দরেও নতুন করে হামলা চালায় তেহরান। কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সৌদি আরব ও ওমানও নিয়মিত ইরানি হামলার শিকার হয়েছে। কাতারের রাস লাফান এলএনজি প্ল্যান্টে ইরানি হামলায় বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা মেরামত করতে কয়েক বছর লেগে যাবে। এত কিছুর পরও আমিরাতের নেতৃত্বের মনে হয়েছে, অন্য কোনো দেশ তাদের মতো তীব্র আক্রমণের মুখোমুখি হচ্ছে না।
এই সংকটে আমিরাত ও ইসরাইল গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং ইরানের অভ্যন্তরে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে যৌথভাবে কাজ করেছে। চলতি মাসে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে একটি বিরল ফোনালাপও অনুষ্ঠিত হয়। মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি নিশ্চিত করেছেন, ইসরাইল ইতোমধ্যেই আমিরাতকে রক্ষায় আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং তা পরিচালনার জন্য সেনা পাঠিয়েছে।
অন্যদিকে, সৌদি আরব গত মার্চ মাসে ইরানের ওপর নিজস্ব উদ্যোগে কিছু হামলা চালালেও পরবর্তীতে তারা সুর নরম করে এবং সংকট সমাধানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাথে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। পাকিস্তান-নেতৃত্বাধীন এই শান্তিপ্রক্রিয়ায় আমিরাতকে যথেষ্ট মূল্যায়ন না করায় ক্ষুব্ধ হয়ে আবুধাবি ইসলামাবাদের ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সুবিধা স্থগিত করে দেয়। পরে সৌদি আরব এগিয়ে এসে পাকিস্তানকে সেই আর্থিক সংকট থেকে উদ্ধার করে।
কাতারের একটি সূত্র জানিয়েছে, তাদের এলএনজি প্ল্যান্টে হামলার পর দোহাও পাল্টা হামলার কথা ভেবেছিল, কিন্তু আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর স্বার্থে তারা শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক পথকেই বেছে নেয়। বাহরাইন ও কুয়েত বরাবরই সৌদির নীতি অনুসরণ করে এই যুদ্ধ থেকে দূরে থেকেছে, আর ওমান ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে শুরু থেকেই নিরপেক্ষ অবস্থানে ছিল। ট্রাম্প প্রশাসন আমিরাতের এই সমন্বিত সামরিক ফ্রন্ট গঠনের প্রচেষ্টার কথা জানত এবং সৌদি ও কাতার এতে অংশ নিক—এমনটাই চেয়েছিল। তবে যুদ্ধ শুরুর আগে এই তিন দেশই ট্রাম্পকে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছিল। তারা আশঙ্কা করেছিল, যুদ্ধ শুরু হলে ইরান তাদের দেশ এবং সেখানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালাবে।
গত কয়েক বছর ধরে এই দেশগুলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগের স্বার্থে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছিল, যা এই যুদ্ধের ফলে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। পুরো পরিস্থিতির বিষয়ে সৌদি ও আমিরাত সরকারের মুখপাত্রদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সূত্র: ব্লুমবার্গ।