• ঢাকা শুক্রবার
    ০৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ২৬ পৌষ ১৪৩২
সাবেক সেনাপ্রধানের জবানবন্দি

‍‍`বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়েছে জিয়াউল আহসান‍‍`

প্রকাশিত: জানুয়ারি ৯, ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

‍‍`বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়েছে জিয়াউল আহসান‍‍`

সিটি নিউজ ডেস্ক

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম-খুনের সংস্কৃতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূইঁয়া। তার এ জবানবন্দিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মে. জে. (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নানা তথ্য উঠে এসেছে। পাশাপাশি গত দেড় দশকের আওয়ামী শাসনামলে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সশস্ত্রবাহিনীতে নানা স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়টিও উঠে আসে।

জবানবন্দিতে সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, ‍‍`র‍্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের (এডিজি) দায়িত্ব পেয়েই অতিরিক্ত উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠেন জিয়াউল। এই পদের দায়িত্ব পালনকালে জিয়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও বাড়িয়ে দেয়।‍‍`

জবানবন্দিতে ইকবাল করিম বলেন, ‍‍`র‍্যাবের ডিজি বেনজীরের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে এডিজি র‍্যাব হিসেবে দায়িত্ব নেন জিয়াউল আহসান। এরপর আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট (এএসইউ) সূত্রে খবর পাই যে কর্নেল জিয়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অস্বাভাবিক ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছেন। তারা আরও জানান, জিয়া নিজের আবাসিক টাওয়ারে একজন গার্ড রেখেছেন, বাসায় অস্ত্র রাখছেন এবং পুরো ফ্ল্যাটে সিসিটিভি বসিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে বলা হয় গার্ড সরিয়ে নিতে, ক্যামেরা খুলে ফেলতে, বাসায় অস্ত্র রাখা থেকে বিরত থাকতে এবং অফিসিয়াল কোয়ার্টারের সামরিক নিয়ম-কানুন মেনে চলতে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার আচরণ আরো উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠে।‍‍`

তিনি বলেন, ‍‍`ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল আমাকে জানান, জিয়ার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মনে হয়েছে যেন, তিনি এমন একজনের সঙ্গে কথা বলছেন যার মস্তিষ্ক পাথর বা ইটের টুকরো দিয়ে ঠাসা। যাকে বোঝানোর কোনো উপায় নেই। এক পর্যায়ে, নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল তারেক সিদ্দিকী, এমএসপিএম, এবং তার কোর্সমেট কর্নেল (বর্তমান মেজর জেনারেল) মাহবুবের ঘনিষ্ঠতার সুবাদে কর্নেল জিয়া আমার নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করা শুরু করেন। আমার আর কোনো উপায় ছিল না-আমি তাকে রেললাইনের পশ্চিম পাশের ক্যান্টনমেন্টে ‍‍`পারসোনা নন গ্রাটা‍‍` (পিএনজি)/অবাঞ্ছিত ঘোষণা করি। তবে পূর্ব পাশের আবাসনে থাকতে তাকে ছাড় দিয়েছিলাম। লগ এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মিজানকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে বলি। এর ফলস্বরূপ, আগে জানানো হয়নি বলে তাকেও নিরাপত্তা উপদেষ্টার বিরাগভাজন হতে হয়েছিল।‍‍`

ইকবাল করিম বলেন, ‍‍`১৯৯৬-২০০১ সময়কালের ভুল পুনরাবৃত্তি এড়াতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। তিনি আওয়ামী লীগকে দেশের একমাত্র ক্ষমতাসীন শক্তি বানাতে নানা পদক্ষেপ নেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, সংবিধান লঙ্ঘনের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা। এছাড়া সেনাবাহিনীতে যেসব অফিসার বেশি মেধাবী বা স্বাধীনচেতা, তাদের ‍‍`বিএনপি বা জামায়াতপন্থি‍‍` বলে চিহ্নিত করে সরিয়ে দেন। তাদের জায়গায় অতীতের সম্পর্ক, আত্মীয়তার যোগসূত্র বা প্রমাণিত আনুগত্যের ভিত্তিতে আরও অনুগত ও অযোগ্য অফিসারদের বসান। ২০০৯ সাল থেকেই ক্লিন হার্ট ও জরুরি শাসনে সিদ্ধ একদল নিরেট অনুগত অফিসার শেখ হাসিনার এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।‍‍`

তিনি বলেন, ‍‍`শেখ হাসিনা মেজর জেনারেল তারেক আহমেদ সিদ্দিকীকে নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি দ্রুতই প্রধানমন্ত্রী ও সেনাবাহিনী প্রধানের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং পিএসও এএফডি-এর মাধ্যমে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পদোন্নতি ও কেনাকাটার ফাইল তার কাছে অনুমোদনের জন্য যেতে বাধ্য করেন। উনি শত শত কোটি টাকার সামরিক কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নেন, কিন্তু নথিপত্রে তার কোনো প্রমাণ রাখেননি। অফিসাররা দ্রুত বুঝে যান প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়। ফলে তারা নিজেদের চিফকে পাশ কাটিয়ে উপদেষ্টার কাছে তদবির শুরু করেন। রাজনীতিবিদরাও সামরিক-সম্পৃক্ত সুবিধার জন্য নিরাপত্তা উপদেষ্টার চারপাশে ভিড় জমাতে থাকেন। এতে সেনা সদর দফতরে তদবিরের চাপ বাড়ে। তারেক আহমেদ সিদ্দিকী ধীরে ধীরে ডিজিএফআই, এনএসআই, এএফডি, বিজিবি, আনসার, এনটিএমসি, ডিজিডিপি, এবং র‍্যাব-এর ওপর নিজের কর্তৃত্ব কায়েম করেন। যেখানে বাধা পান, সেখান থেকে পূর্বতন কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিয়ে নিজস্ব অনুগত অফিসার বসান। তার নির্দেশনায় ডিজিএফআই, এনএসআই এবং র‍্যাব গুম, খুন, অপহরণ, জমি দখল, ব্যবসা-বাণিজ্যে চাঁদাবাজি, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।

উল্লেখ্য, বিগত ১৫ বছরে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে খুনের মামলায় মে. জে. (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি শেষ হয়েছে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আগামী ১৪ জানুয়ারি আদেশের জন্য দিন ধার্য করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনা এই দিন ধার্য করেন। জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া।

জাতীয় সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ