প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম
আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সির সঙ্গে লিওনেল মেসির দুই দশকের মহাকাব্যিক যাত্রার শেষ হলো এক আবেগঘন চিঠিতে। আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন কিংবা দীর্ঘ কোনো বিবৃতির বদলে নিজের হাতে লেখা তিন পাতার চিঠি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও ক্লাব ফুটবল থেকে অবসর নেননি তিনি।
মেসির বিদায়ী চিঠির সবচেয়ে আবেগঘন তথ্যটি এসেছে একেবারে শেষ লাইনে। তিনি জানিয়েছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দিন পর, ২১ জুলাই তিনি এই চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু এরপর তার বাবা জর্জ মেসির মৃত্যু তার সিদ্ধান্তকে আরও দৃঢ় করে। জর্জ মেসি ৮ আগস্ট মারা যান। মেসির ভাষায়, বাবাকে হারানোর পর তিনি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত হয়েছেন যে জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সময় এসে গেছে।

বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের পরই মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই জল্পনার অবসান ঘটিয়ে তিনি জানিয়ে দিলেন—আর আর্জেন্টিনার জার্সি পরে মাঠে নামবেন না।
এই সিদ্ধান্ত আত্মাকে ব্যথা দেয়: বিদায়ী চিঠিতে মেসি জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তটি নেওয়া তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে চিন্তা-ভাবনা করার পর তিনি বুঝেছেন, এটাই সরে দাঁড়ানোর উপযুক্ত সময়।
আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি সবসময় নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন। শুধু সাম্প্রতিক সাফল্যের সময় নয়, তার আগের কঠিন সময়েও জাতীয় দলের জার্সির জন্য লড়াই করেছেন তিনি।

মেসির কাছে জাতীয় দলের হয়ে খেলা ছিল শুধু একটি ফুটবল ম্যাচে অংশ নেওয়া নয়। দেশের মানুষকে আনন্দ দেওয়া এবং আর্জেন্টাইন হিসেবে তাদের গর্বিত করাও ছিল তার অন্যতম প্রেরণা।
আমি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি, আর কিছু দেওয়ার নেই: চিঠির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো মেসির উপলব্ধি—তিনি জাতীয় দলের জন্য নিজেকে পুরোপুরি উজাড় করে দিয়েছেন।
নতুন প্রজন্মের একঝাঁক প্রতিভাবান ফুটবলার উঠে আসায় তাদের জায়গা করে দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। অর্থাৎ নিজের বিদায়কে তিনি শুধু একটি ক্যারিয়ারের সমাপ্তি হিসেবে দেখছেন না; বরং নতুনদের হাতে জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ তুলে দেওয়ার সময় হিসেবেও দেখছেন।
সমর্থকদের ভালোবাসা মিস করবেন মেসি: দুই দশক ধরে পাওয়া আর্জেন্টিনার সমর্থকদের ভালোবাসার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন মেসি।

মাঠের ভেতর থেকে গ্যালারির সমর্থকদের গর্জন আর শুনতে পারবেন না—এ কথা উল্লেখ করে তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি তিনি ভীষণভাবে মিস করবেন। তবে আর্জেন্টিনা থেকে দূরে যাচ্ছেন না তিনি।
এখন থেকে মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে একজন সাধারণ সমর্থকের মতো জাতীয় দলকে সমর্থন করবেন—ভালো সময়ের পাশাপাশি খারাপ সময়েও।
পরিবার, কোচ ও সতীর্থদের ধন্যবাদ: দীর্ঘ এই যাত্রায় পাশে থাকার জন্য পরিবারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মেসি। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে তার সঙ্গে কাজ করা কোচ, সতীর্থ ও কর্মকর্তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি।
তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে যেমন এসেছে হতাশা ও ব্যর্থতা, তেমনি এসেছে ইতিহাস গড়া অসংখ্য মুহূর্ত। সবকিছু মিলিয়ে তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন এমন সব স্মৃতি, যা তার নিজের ভাষায় ‘অবিস্মরণীয়’।
সমালোচনা থেকে বিশ্বজয়: ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অভিষেকের পর মেসির পথচলা কখনোই সহজ ছিল না। একাধিক বড় ফাইনালে পরাজয়ের কারণে দীর্ঘ সময় তাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই মেসিই আর্জেন্টিনাকে ২০২২ বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন। তার নেতৃত্বে এসেছে ২০২১ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ ফাইনালিসিমার শিরোপা। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের আগে ২০০৫ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ ও ২০০৮ অলিম্পিক স্বর্ণও জিতেছেন তিনি।
জাতীয় দলের হয়ে মেসির বিদায়ের সময় তার নামের পাশে রয়েছে ২০ বছরের বেশি সময়ের ক্যারিয়ার, ২০৭ ম্যাচ ও ১২৫ গোল। আর্জেন্টিনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবেই বিদায় নিচ্ছেন তিনি।
চিঠির পাশে যে কলম আলোচনায়: মেসির হাতে লেখা চিঠির ছবিতে একটি বিশেষ কলমও নজর কেড়েছে। কলমটিতে ‘হ্যারি পটার’-এর টাইম-টার্নার প্রতীক রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা ও কৌতূহল। তবে মেসি কেন ওই কলমটি ব্যবহার করেছেন, সে বিষয়ে তিনি নিজে কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
শেষে শুধু আর্জেন্টিনা: বিদায়ী চিঠির শেষ দিকে মেসির কথাগুলো যেন তার পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সারাংশ।
পরিবার, সতীর্থ, কোচ ও সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর পর তিনি লিখেছেন—আর্জেন্টিনার হয়ে পাওয়া গর্ব ও শান্তি নিয়েই তিনি বিদায় নিচ্ছেন।
সবশেষে তার বার্তা: ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমাকে আর্জেন্টাইন বানানোর জন্য।’
তারপর— ‘ভামোস আর্জেন্টিনা।’ একজন ফুটবলারের বিদায় হয়তো এর চেয়ে আবেগঘন আর কীভাবে হতে পারে?
দুই দশকেরও বেশি সময় যে নীল-সাদা জার্সি ছিল তার পরিচয়ের অংশ, সেটি এবার তুলে রাখলেন মেসি। তবে আর্জেন্টিনাকে নয়।
মাঠের বাইরে থেকে এবার তিনি গলা মেলাবেন সমর্থকদের সঙ্গে। মেসি চলে গেলেন জাতীয় দলের মাঠ থেকে—কিন্তু আর্জেন্টিনা থেকে নয়।