প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬, ০২:১২ পিএম
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদটি সংবিধান অনুযায়ী দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকা একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তি নয়, এই পদটির মর্যাদা, নিরপেক্ষতা ও জনগণের আস্থা—গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। তাই রাষ্ট্রপতির প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি আচরণ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিকভাবে গভীর তাৎপর্য বহন করে। মো. সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি হিসেবে পুরো অধ্যায়টি পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তার যাত্রার শুরু যেমন বিতর্কে, সমাপ্তিও হলো বিতর্কের মধ্য দিয়েই।
২০২৩ সালে যখন আওয়ামী লীগ তাকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়, তখন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বড় অংশের কাছেই তার নাম ছিল অপ্রত্যাশিত। সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় তিনি ছিলেন না। ফলে তার মনোনয়ন ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের ভেতরেও নানা প্রশ্ন ও অসন্তোষের খবর সামনে আসে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় তার অতীতের কিছু বক্তব্য ও আচরণ, যা রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগেই তাকে সমালোচনার মুখে ফেলেছিল।

বিশেষ করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কদমবুসি করার বিষয়টি নিজেই প্রকাশ্যে স্বীকার করে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার আগে এমন প্রকাশ্য আনুগত্যের প্রদর্শন অনেকের কাছেই ভবিষ্যতের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছিল। কারণ রাষ্ট্রপতির কাছে রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, সাংবিধানিক নিরপেক্ষতাই সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরও বিতর্ক তার পিছু ছাড়েনি। বরং সময়ের সঙ্গে তা আরও গভীর হয়েছে। তার বিভিন্ন বক্তব্য, সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকার এবং রাজনৈতিক ঘটনাবলিকে ঘিরে মন্তব্য বারবার তাকে বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে মনে হয়েছে, তিনি এমন বিষয়ে প্রকাশ্যে মত দিয়েছেন, যেখানে রাষ্ট্রপতির নীরবতাই হয়তো অধিকতর প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার পরিচায়ক হতে পারত।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন, সরকার পরিবর্তন, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী ঘটনাবলিতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। সরকার পরিবর্তনের সাংবিধানিক ধাপগুলো সম্পন্ন করার পর তিনি পরবর্তীকালে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমন কিছু মন্তব্য করেন, যা নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রম নিয়ে তার বক্তব্য এবং তাকে জোর করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হয়েছিল—এ ধরনের দাবি রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

আরও বড় সংকট তৈরি হয় শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। একদিকে জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। পরে আবার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তার কাছে পদত্যাগপত্রের কোনো প্রামাণ্য কপি ছিল না। একই বিষয়ে রাষ্ট্রপতির দুই ভিন্ন বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক বিতর্কই সৃষ্টি করেনি, সাংবিধানিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও সামনে এনেছে। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকে জনগণ রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করে। সেখানে এমন অসঙ্গতি প্রতিষ্ঠানগত আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
রাষ্ট্রপতির পদে থেকে সংবাদমাধ্যমে ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার দেওয়া এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করাও সমালোচনার জন্ম দেয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও, দায়িত্ব পালনকালে তার প্রতিটি বক্তব্যের রাজনৈতিক অভিঘাত বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। কারণ রাষ্ট্রপতির ভাষা শুধু ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রেরও ভাষা।
অন্যদিকে, একটি বিষয়ও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, অত্যন্ত অস্থির রাজনৈতিক সময়ে তিনি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দায়িত্ব পালন করেছেন। তার সমর্থকদের দাবি, সংকটকালীন সময়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে না পড়ে, সেই ধারাবাহিকতা রক্ষায় তিনি ভূমিকা রেখেছেন। এই মূল্যায়নও আলোচনার অংশ হওয়া উচিত। ইতিহাস কখনো একপাক্ষিক নয়; রাষ্ট্রনায়কদের মূল্যায়নও হয় বহু দৃষ্টিকোণ থেকে।
তবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্য এবং রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার মধ্যে যে সূক্ষ্ম সীমারেখা রয়েছে, সেটি অতিক্রম করার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে বারবার উঠেছে। রাষ্ট্রপতির প্রতি জনগণের আস্থা মূলত গড়ে ওঠে এই বিশ্বাসের ওপর যে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, পুরো রাষ্ট্রের অভিভাবক। সেই ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান।
সবশেষে তার পদত্যাগও বিতর্কমুক্ত থাকেনি। পদত্যাগপত্রে তিনি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কথা উল্লেখ করে দায়িত্ব পালনে অক্ষমতার কথা জানান। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক চাপ, বিতর্ক এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে অনেকেই মনে করছেন, কেবল স্বাস্থ্যগত কারণই এই সিদ্ধান্তের একমাত্র ব্যাখ্যা নয়। যদিও এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে ইতিহাসের আরও সময় প্রয়োজন।
মো. সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতিত্ব বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে নিঃসন্দেহে আলোচিত একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে। তবে এই অধ্যায় থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত—রাষ্ট্রপতির পদে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই মুখ্য। এই পদে যিনি অধিষ্ঠিত হবেন, তার রাজনৈতিক অতীত থাকতে পারে; কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পর তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত, বক্তব্য ও আচরণে এমন নিরপেক্ষতার প্রতিফলন থাকতে হবে, যাতে কোনো নাগরিকের মনে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির মর্যাদা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি না হয়।
গণতন্ত্রে ব্যক্তি আসে, ব্যক্তি যায়; কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে। সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখাই হওয়া উচিত ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।