• ঢাকা সোমবার
    ২০ জুলাই, ২০২৬, ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

১২০ মিনিটের মহাকাব্যে বিশ্বজয়ের নতুন ইতিহাস, অপূর্ণ রইল আলবিসেলেস্তেদের স্বপ্ন

প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ১২:০৪ পিএম

১২০ মিনিটের মহাকাব্যে বিশ্বজয়ের নতুন ইতিহাস, অপূর্ণ রইল আলবিসেলেস্তেদের স্বপ্ন

বিশেষ প্রতিনিধি

ফুটবল কখনো শুধু গোলের খেলা নয়। এটি অপেক্ষার, বিশ্বাসের, আবেগের এবং কখনো কখনো ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের নাম। তাই বিশ্বকাপের ফাইনালও শুধু একটি ট্রফির লড়াই নয়; এটি একটি জাতির গর্ব, কোটি মানুষের ভালোবাসা আর ইতিহাস লেখার মঞ্চ। সেই মঞ্চেই রবিবার রাতে নিউ জার্সির নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে জন্ম নিল আরেকটি অমর ফুটবল মহাকাব্য। ১২০ মিনিটের শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই শেষে অতিরিক্ত সময়ের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে স্পেন। শেষ বাঁশি বাজতেই লাল-হলুদে রঙিন হয়ে ওঠে স্টেডিয়াম, আর নীল-সাদা জার্সিগুলো নীরবে ডুবে যায় পরাজয়ের অশ্রুতে।

এটি শুধু দুই দলের লড়াই ছিল না; ছিল দুই ফুটবল দর্শনের সংঘর্ষ। একদিকে বলের দখল, শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা আর ধৈর্যের ফুটবল। অন্যদিকে প্রতিভা, সৃজনশীলতা, অভিজ্ঞতা এবং মুহূর্তের জাদুর অপেক্ষায় থাকা আর্জেন্টিনা। ম্যাচের শুরু থেকেই স্পেন যেন একটি নিখুঁত পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামে। মাঝমাঠে রদ্রি ছিলেন নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়, পেদ্রি ছন্দ তৈরি করেছেন, লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস দুই প্রান্ত দিয়ে একের পর এক আক্রমণ সাজিয়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছেন। বলের দখল, পাসের নির্ভুলতা ও আক্রমণের ধার—সবকিছুতেই এগিয়ে ছিল লা রোজা।

No photo description available.

তবে স্পেনের সেই আধিপত্যের মাঝেও আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিলেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করে তিনি যেন একাই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস ও স্পেনের আক্রমণভাগের একাধিক নিশ্চিত সুযোগ নষ্ট করে তিনি আর্জেন্টিনার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখেন। কিন্তু ফুটবল এমনই নির্মম—একজন গোলরক্ষক পুরো দলের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন না।

বিশ্বজুড়ে কোটি সমর্থকের চোখ ছিল লিওনেল মেসির দিকে। হয়তো এটি তার শেষ বিশ্বকাপ, হয়তো শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল। কিন্তু স্পেনের কৌশল ছিল পরিষ্কার—মেসিকে থামাতে পারলেই শিরোপার পথ অনেকটাই সহজ হবে। সেই পরিকল্পনাই নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করে তারা। বল পেলেও জায়গা পাননি মেসি। ড্রিবল শুরু করার আগেই চাপ, পাস দেওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে গেছে পথ। পুরো ম্যাচজুড়ে তাকে কার্যত নিষ্ক্রিয় রাখতেই সফল হয় স্পেন।

No photo description available.

নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। তখনও আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে স্পেন। অবশেষে ১০৬তম মিনিটে আসে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। ডান প্রান্ত দিয়ে নিকো উইলিয়ামসের তৈরি করা আক্রমণ থেকে বদলি হিসেবে নামা ফেরান তোরেস নিখুঁত ফিনিশে বল জালে জড়িয়ে দেন। মুহূর্তেই উল্লাসে ফেটে পড়ে স্পেন শিবির। সেই এক গোলই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেয় বিশ্বকাপের ভাগ্য।

গোল হজমের পর সমতায় ফেরার মরিয়া চেষ্টা চালায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু শেষদিকে এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে তাদের লড়াই আরও কঠিন হয়ে পড়ে। সংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে স্পেন এবং নিশ্চিত করে ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় একটি বিশ্বকাপ জয়।

May be an image of soccer, football and cleats

রেফারির শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গেই একই মাঠে দেখা যায় দুই বিপরীত দৃশ্য। স্পেনের ফুটবলাররা আনন্দে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন, জাতীয় পতাকা কাঁধে নিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠেন। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের কেউ হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন, কেউ মুখ ঢেকে কান্না লুকানোর চেষ্টা করেন। লিওনেল মেসি নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। তার মুখে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল শুধু অপূর্ণ এক স্বপ্নের ভার। গ্যালারিতেও একই ছবি—এক পাশে লাল-হলুদ পতাকার ঢেউ, অন্য পাশে নীল-সাদা পতাকা জড়িয়ে অশ্রুসিক্ত সমর্থকদের নীরবতা।

এই ফাইনাল শুধু একটি শিরোপার গল্প নয়; এটি আধুনিক ফুটবলেরও একটি ঘোষণা। ইউরো জয়ের পর বিশ্বকাপও নিজেদের করে নিয়ে স্পেন প্রমাণ করেছে, পরিকল্পিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দলগত ফুটবলই এখন সাফল্যের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি। লামিন ইয়ামাল, পেদ্রি, নিকো উইলিয়ামস, রদ্রি ও ফেরান তোরেসদের হাত ধরে বিশ্ব ফুটবল যেন নতুন এক যুগে প্রবেশ করল।

May be an image of soccer, football, crowd and text that says ‍‍`BOEDS B.IGLESIK LESI B. AYT LAPORTE 14 FERRAN 이‍‍`

বিশ্বকাপের ট্রফি প্রতি চার বছর পর নতুন হাতে ওঠে, কিন্তু কিছু ফাইনাল ফলাফলের জন্য নয়, আবেগের জন্য ইতিহাসে বেঁচে থাকে। ২০২৬ সালের এই ফাইনালও তেমনই একটি রাত। যেখানে স্পেন লিখেছে গৌরবের নতুন অধ্যায়, আর্জেন্টিনা রেখে গেছে অপূর্ণ স্বপ্নের এক বেদনাময় স্মৃতি, আর ফুটবল আবারও প্রমাণ করেছে—এই খেলার সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো লেখা হয় উল্লাস, অশ্রু, বিশ্বাস আর ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের কালি দিয়ে।

ক্রীড়া জগৎ সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ