• ঢাকা শুক্রবার
    ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩ মাঘ ১৪৩২

গাজায় টেকনোক্র্যাট সরকার গঠন

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৬, ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম

গাজায় টেকনোক্র্যাট সরকার গঠন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা পরিচালনার জন্য ১৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট সরকার গঠন করা হয়েছে।

১৪ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় এই সরকার গঠন হয় বলে আজ শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে মিডল ইস্ট আই। 

নবনিযুক্ত এই ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধপরবর্তী এক অন্তর্বর্তী সময়ে এই সংস্থাটি গাজা পরিচালনা করবে। অক্টোবর থেকে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতির নাজুক দ্বিতীয় ধাপ এগিয়ে নিতে ওয়াশিংটন এই পরিকল্পনা সামনে আনছে।

ট্রাম্প জানান, ‘ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক গভর্নমেন্ট’ নামে পরিচিত এই কাঠামোর আনুষ্ঠানিক নাম হবে ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা। এটি একটি অস্থায়ী প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে, যার লক্ষ্য হবে দীর্ঘ মাসের যুদ্ধের পর গাজাকে স্থিতিশীল করা।

ট্রাম্পের প্রস্তাব অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট সংস্থাটি একটি আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধায়ক কাঠামোর অধীনে কাজ করবে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বোর্ড অব পিস’। এই বোর্ড গাজার প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি নিজেই এই বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকবেন এবং শিগগিরই অন্য সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হবে।

অক্টোবরে ইসরাইল ও হামাস নীতিগতভাবে এই কাঠামোয় সম্মতি দিলেও, বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক ও বাস্তব জটিলতা এখনো রয়ে গেছে।

অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। ইসরাইল ও হামাস পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবরের পর থেকে ১০০ জনের বেশি শিশুসহ অন্তত ৪৪০ জন ফিলিস্তিনি এবং তিনজন ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছেন।

গাজা-মিসর সীমান্ত ক্রসিং পুনরায় চালু করতে ইসরাইলের দেরি, হামাসের অস্ত্র ত্যাগে অস্বীকৃতি এবং সর্বশেষ ইসরাইলি বন্দির মরদেহ সংক্রান্ত অমীমাংসিত বিষয়গুলো উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।

যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে অগ্রসর হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রধান বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের মাত্রা এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনা।

ট্রাম্প বলেছেন, মিসর, কাতার ও তুরস্ক হামাসের সঙ্গে একটি ‘সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি’ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে।

মধ্যস্থতাকারী দেশ মিসর, কাতার ও তুরস্কের যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি শাসন কমিটিতে ১৫ জন সদস্য থাকবেন। এর নেতৃত্ব দেবেন আলি শাথ, যিনি পশ্চিমা সমর্থিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাবেক উপমন্ত্রী।

শাথ আগে শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকি করেছেন এবং তাকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নেতা না হয়ে একজন টেকনোক্র্যাট হিসেবেই দেখা হয়।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, মনোনীত ফিলিস্তিনি নেতারা শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে বহু বিশ্লেষক প্রস্তাবিত শাসন মডেলটির কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সমালোচকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি তত্ত্বাবধায়ক বোর্ড কার্যত বিদেশি বা ঔপনিবেশিক শাসনের মতো চেহারা নিতে পারে, যা প্রকৃত ফিলিস্তিনি আত্মশাসনের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফিলিস্তিনিদের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের কোনো সুস্পষ্ট ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে ৬০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি প্রায় পুরো জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

একাধিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ও জাতিসংঘের একটি তদন্ত এই অভিযানের চরিত্রকে গণহত্যার শামিল বলে উল্লেখ করেছে। তবে ইসরাইল এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, ২০২৩ সালে হামাসের হামলায় ১,২০০ মানুষ নিহত হওয়া এবং ২৫০ জনের বেশি মানুষকে জিম্মি করার পর তারা আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেছে।

টেকনোক্র্যাট প্রশাসন স্বল্পমেয়াদে শৃঙ্খলা আনতে পারলেও তত্ত্বাবধায়ক বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে ট্রাম্পের ভূমিকা ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক স্বাধিকারকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে এবং বাইরের আধিপত্যের ধারণা আরও জোরালো করতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, এই পরিকল্পনা রাজনৈতিক পুনর্মিলনের চেয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকে—বিশেষ করে হামাসের নিরস্ত্রীকরণকে—অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিনিধিত্বের দিকে বিশ্বাসযোগ্য কোনো পথ না থাকলে, এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেতে ব্যর্থ হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত যে অস্থিরতা দূর করার কথা, সেটিই আবার নতুন করে তৈরি করতে পারে।

আর্কাইভ