প্রকাশিত: জুলাই ৪, ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গত ১৭ বছর ছিল অস্থিরতা, সংঘাত, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং গণতান্ত্রিক সংকটের এক দীর্ঘ অধ্যায়। এই সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন, গণগ্রেপ্তার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন, সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইনের প্রয়োগ নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং নাগরিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, বরং রাষ্ট্রব্যবস্থা, ন্যায়বিচার এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এই আন্দোলনে ছাত্র, তরুণ, শ্রমিক, শিক্ষক, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। অনেকে প্রাণ হারান, অসংখ্য মানুষ আহত হন এবং বহু পরিবার আজও সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে।
জুলাই জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়; এটি পুরো জাতির অর্জন। এই বক্তব্য কেবল রাজনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং জাতীয় ইতিহাসকে একটি যৌথ সম্পদ হিসেবে দেখার আহ্বান।
তিনি আরও বলেছেন, যারা মানুষ হত্যা করেছে তাদের বিচার অবশ্যই হবে, তবে সেই বিচার হতে হবে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দর্শন নিহিত রয়েছে। অতীতে যদি বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হয়ে থাকে, তবে নতুন বাংলাদেশে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়—এই অঙ্গীকারই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ ন্যায়বিচার কখনো প্রতিশোধের সমার্থক নয়; ন্যায়বিচার হলো সত্য উদ্ঘাটন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধীর যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
গত ১৭ বছরের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সামনে একটি স্পষ্ট শিক্ষা রেখে গেছে—গণতন্ত্র দুর্বল হলে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংসদের কার্যকারিতা কমে যায়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, নির্বাচন নিয়ে জনআস্থা হ্রাস পায়, প্রশাসন রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের দূরত্ব বাড়তে থাকে। এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, কার্যকর নির্বাচন ব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং একটি নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম ভিত্তি। স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সামনে আসে না। তাই নতুন বাংলাদেশ গঠনের পথে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
একইভাবে মানবাধিকার রক্ষাও রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা নির্যাতনের প্রতিটি অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। কোনো অপরাধী যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে দায়মুক্তি না পায়, আবার কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার না হন—এই ভারসাম্য রক্ষা করাই আইনের শাসনের মূল চেতনা।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। তিনি তাঁর পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্যাতনের কথা স্মরণ করে বলেছেন, প্রতিহিংসা নয়, বরং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়ার শিক্ষাই তিনি পরিবার থেকে পেয়েছেন। রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর প্রকৃত মূল্যায়ন হবে বাস্তব নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে সেই দর্শনের প্রতিফলন ঘটলে।
আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা। দীর্ঘ রাজনৈতিক বিভাজন সমাজে অবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন, বিচার, প্রশাসন, শিক্ষা ও অর্থনীতিসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, বরং ভিন্নমতের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, রপ্তানি, কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে টেকসই সংস্কার ছাড়া রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছাবে না। জনগণ শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, জীবনের পরিবর্তন চায়।
জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগের সবচেয়ে বড় সম্মান হবে এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত হবে, আইনের চোখে সবাই সমান হবে, আদালত স্বাধীনভাবে বিচার করবে, প্রশাসন দলীয় প্রভাবমুক্ত থাকবে, সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে এবং মতপ্রকাশের কারণে কেউ নির্যাতনের শিকার হবে না।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রতিশোধ কখনো জাতিকে এগিয়ে নেয় না; ন্যায়বিচার, সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধই একটি রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান যদি সত্যিই নতুন বাংলাদেশের সূচনা হয়ে থাকে, তবে সেই বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে আইনের শাসন, মানবাধিকার, জবাবদিহি, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং জাতীয় ঐক্যের ভিত্তির ওপর।
জুলাইয়ের রক্ত শুধু শোকের স্মৃতি নয়—এটি একটি দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব হলো এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে রাষ্ট্রের শক্তি হবে জনগণের আস্থা, বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্রের অবিচল চর্চা। তখনই জুলাইয়ের আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকবে।