• ঢাকা বৃহস্পতিবার
    ১২ মার্চ, ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২

ইরান যুদ্ধে আমেরিকার পরাজয়: যা ঘটতে পারে

প্রকাশিত: মার্চ ১২, ২০২৬, ১২:০৪ এএম

ইরান যুদ্ধে আমেরিকার পরাজয়: যা ঘটতে পারে

আব্দুল বারী, ঢাকা

বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ কেবল সামরিক শক্তির বিষয় নয়; বরং এটি মার্কিন অর্থনীতির টিকে থাকার লড়াই। ইরান-আমেরিকা যুদ্ধে যদি ওয়াশিংটন সামরিক বা কৌশলগতভাবে পরাজিত হয়, তবে তার প্রভাব কেবল রণক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা হবে মার্কিন ডলারের “একচেটিয়া আধিপত্যের” কফিনে শেষ পেরেক।

পেট্রোডলারের মৃত্যু ও রিজার্ভ কারেন্সির সংকট

১৯৭০-এর দশকে সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে জন্ম নেওয়া ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থা আমেরিকার অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে পরাজয় মানেই তেলের বাজারে ডলারের বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে যাওয়া।
    •    ডলারের কৃত্রিম চাহিদা হ্রাস: বিশ্বজুড়ে তেলের লেনদেনে ডলারের ব্যবহার বন্ধ হলে দেশগুলো আর ডলার মজুত রাখতে বাধ্য থাকবে না।
    •    অর্থনৈতিক সক্ষমতা হ্রাস: ডলারের মান পড়ে গেলে মার্কিন অর্থনীতির সামগ্রিক সক্ষমতা ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে।

পুঁজি বিনিয়োগ ও তারল্য সংকট

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো (সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত) আমেরিকার বিভিন্ন খাতে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করে রেখেছে।
    •    সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি খাত, আবাসন এবং সরকারি বন্ডে এই বিশাল অর্থ আমেরিকার জন্য ‘অক্সিজেন’ হিসেবে কাজ করে।
    •    আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হলে এই বিশাল বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সম্ভাবনা দেখা দেবে, যা মার্কিন বড় কোম্পানিগুলোকে গভীর দেউলিয়াত্বের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

প্রতিরক্ষা শিল্পের বিপর্যয়

আমেরিকার মোট অস্ত্র রপ্তানির প্রায় ৪৫% থেকে ৫০% গন্তব্য হলো মধ্যপ্রাচ্য।
    •    যুদ্ধে হারলে বা প্রভাব হারালে এই বিশাল বাজার বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
    •    এর ফলে আমেরিকার প্রতিরক্ষা খাত একটি ‘রুগ্ন শিল্পে’ পরিণত হবে এবং দেশটিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ বেকার হয়ে পড়তে পারে।

জ্বালানি ও বাণিজ্য করিডোরের নিয়ন্ত্রণ হারানো

আমেরিকা প্রচুর পরিমানে তেল উৎপাদন করে। তারপরও তারা বৈশ্বিক বাজারে তেলের দর নিয়ন্ত্রণে ওপেকের (OPEC) ওপর নির্ভরশীল। তাই তাদের তেলের দাম বাড়ানোর জন্য মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ তাদের জন্য ফরজ।
    •    হরমুজ প্রণালী: যুদ্ধের ফলাফল হিসেবে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে হলো আমেরিকার জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি সরাসরি ০.৫% থেকে ১% কমে যাওয়া।
    •    দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য: মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে আমেরিকার প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, যা তাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রায় ১৫% থেকে ২০% নিয়ন্ত্রণ করে।

বিকল্প শক্তির উত্থান: ব্রিকস (BRICS) ও ইউয়ান (Yuan)

আমেরিকার শূন্যস্থান পূরণে চীন ও রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
    •    পেট্রো-ইউয়ান: চীন ইতিমধ্যে তেলের দাম ডলারে নির্ধারণ না করে ‘ইউয়ান’-এ করার প্রস্তাব দিয়েছে।
    •    ব্রিকস সম্প্রসারণ: ২০২৪–২৫ সালে সৌদি আরব, ইরান, মিশর ও আমিরাতের ব্রিকসে যোগদান পেট্রোডলারের অস্তিত্বকে ২০৩০ সালের মধ্যে চরম সংকটে ফেলতে পারে। দেশগুলো এখন ‘কমন কারেন্সি’ বা স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনে আগ্রহী।

সৌদি আরবের কৌশলগত মোড়

সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সাম্প্রতিক অবস্থান থেকে স্পষ্ট যে, তারা আর আমেরিকার ‘আশ্রিত রাষ্ট্র’ হয়ে থাকতে চায় না। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি নীতি (OPEC+) সমন্বয়ের মাধ্যমে তারা ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনছে।

আমেরিকার ‘সুপারপাওয়ার’ তকমা হারানোর ঝুঁকি 

 আমেরিকা তার প্রভাব টিকিয়ে রাখতে ‘ইন্ডিয়া–মিডল ইস্ট–ইউরোপ ইকোনমিক করিডোর’ (IMEC)-এর মতো বড় প্রকল্প হাতে নিলেও যুদ্ধের ময়দানে পরাজয় বা কৌশলগত পিছুটান তাদের অনেক পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকার বিদায় মানেই ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য বিলীন হওয়া এবং আমেরিকার ‘সুপারপাওয়ার’ তকমা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হওয়া।

আর্কাইভ