• ঢাকা শুক্রবার
    ২৬ জুন, ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩

ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে শান্তির অপেক্ষা

প্রকাশিত: জুন ২৬, ২০২৬, ০১:২৫ পিএম

ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে শান্তির অপেক্ষা

সৈয়দ আতিক

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় গ্রীষ্মকাল শুরু হলেও প্রায় ১০ লাখ মানুষ এখনও তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করছে। নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল (এনআরসি) জানিয়েছে, আশ্রয় সংকট, ত্রাণসামগ্রীর ঘাটতি এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার পরিবার তাঁবুতে বসবাস করছে, ৫ হাজার পরিবার খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছে এবং আরও ৫২ হাজার পরিবার অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহে এসব মানুষের দুর্ভোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে।

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনেক জনপদের নাম আছে, যা শুনলেই যুদ্ধ, মৃত্যু এবং মানুষের অসহায়ত্বের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি হলো গাজা। ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী এই ছোট্ট ভূখণ্ড আজ শুধু একটি ভূ-রাজনৈতিক সংকটের নাম নয়; এটি মানবিক বিপর্যয়, বাস্তুচ্যুতি, ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা এবং বেঁচে থাকার মরিয়া সংগ্রামের প্রতীক।

গাজার দিকে তাকালে আজ পৃথিবী এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়—সভ্যতা কি সত্যিই এগিয়েছে, নাকি আমরা কেবল প্রযুক্তিগত উন্নতির আড়ালে মানবিক মূল্যবোধকে হারিয়ে ফেলেছি?

একসময় যে শহরের রাস্তায় শিশুদের হাসি শোনা যেত, বাজারে মানুষের ভিড় থাকত, সমুদ্রতীরে পরিবারগুলো সময় কাটাত, সেই গাজার বড় অংশ আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বহু পরিবার তাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতি হারিয়েছে। যে ঘর একদিন ছিল নিরাপত্তার প্রতীক, তা আজ কেবল ভাঙা ইট-পাথরের স্তূপ।

একজন মানুষের কাছে ঘর হারানো মানে শুধু একটি ভবন হারানো নয়। এর অর্থ নিজের পরিচয় হারানো, স্মৃতি হারানো, শেকড় হারানো। গাজার লাখো মানুষ সেই বেদনাই প্রতিদিন বয়ে বেড়াচ্ছে।

আজ গাজার বিস্তীর্ণ এলাকায় অসংখ্য মানুষ তাঁবুতে বসবাস করছে। তীব্র গরমে সেই তাঁবুগুলো অনেক সময় অগ্নিগর্ভ চুল্লির মতো হয়ে ওঠে। দিনের প্রখর রোদে প্লাস্টিক ও কাপড়ের তৈরি আশ্রয়ের ভেতরে বসে থাকা শিশুদের কষ্ট কল্পনা করাও কঠিন। অনেক মা তাদের সন্তানকে ছায়া দেওয়ার জন্য নিজেদের শরীরকে ঢাল বানিয়ে রাখেন। কিন্তু মাতৃত্বের ভালোবাসা সূর্যের উত্তাপ থামাতে পারে না, ক্ষুধা দূর করতে পারে না, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।

গাজার সংকটকে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। কারণ সংখ্যার পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের গল্প। প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবার, একটি জীবন, একটি স্বপ্নের প্রতিনিধিত্ব করে। যখন বলা হয় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, তখন তার অর্থ হাজার হাজার অসমাপ্ত জীবনকাহিনি। যখন বলা হয় লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত, তখন তার অর্থ লাখো মানুষ জানে না আগামীকাল কোথায় ঘুমাবে।

সবচেয়ে মর্মান্তিক বাস্তবতা হলো শিশুদের জীবন। পৃথিবীর কোনো শিশুর শৈশব যুদ্ধের শব্দ, ধ্বংসস্তূপ এবং আতঙ্কের মধ্যে কাটার কথা নয়। কিন্তু গাজার বহু শিশুর কাছে যুদ্ধই হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক বাস্তবতা। তারা জানে না নিরবচ্ছিন্ন শান্তি কাকে বলে। তারা জানে না নিশ্চিন্তে স্কুলে যাওয়া কেমন অনুভূতি। তারা জানে না রাতের ঘুম ভেঙে বিস্ফোরণের শব্দ না শোনা কাকে বলে।

একটি শিশু যখন তার আঁকার খাতায় বাড়ির বদলে ট্যাংক, ধোঁয়া আর ভাঙা ভবনের ছবি আঁকে, তখন বুঝতে হবে যুদ্ধ শুধু স্থাপনা ধ্বংস করে না; এটি ভবিষ্যৎও ধ্বংস করে।

স্বাস্থ্যখাতের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। হাসপাতালগুলো সীমিত সম্পদ নিয়ে কাজ করছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিনিয়ত অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা করছেন। ওষুধের ঘাটতি, যন্ত্রপাতির অভাব এবং অবিরাম চাপের মধ্যেও তারা জীবন বাঁচানোর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু যখন আহত মানুষের সংখ্যা চিকিৎসা সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়, তখন মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হয়।

খাদ্য ও পানির সংকটও সমানভাবে ভয়াবহ। বিশুদ্ধ পানির অভাব, পর্যাপ্ত খাদ্যের সংকট এবং মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। একজন বাবা যখন নিজের সন্তানের জন্য একমুঠো খাবার জোগাড় করতে ব্যর্থ হন, তখন সেই অসহায়ত্ব শুধু ব্যক্তিগত নয়; তা সমগ্র মানবতার ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

গাজার নারীরা এই সংকটের আরেকটি নীরব মুখ। সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখা, খাবার জোগাড় করা, অস্থায়ী আশ্রয়ে পরিবারকে ধরে রাখা—সবকিছুর ভার তাদের কাঁধে এসে পড়ে। তবুও তারা আশা ছাড়েন না। কারণ আশা হারিয়ে গেলে বেঁচে থাকার কারণও হারিয়ে যায়।

গাজার এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য কখনো শুধু সামরিক বা রাজনৈতিক হিসাব দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। এর সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। যারা অস্ত্র ধরেনি, যারা কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি, যারা শুধু স্বাভাবিক জীবন চেয়েছিল—তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিশ্ব রাজনীতির টেবিলে গাজা হয়তো একটি ইস্যু, একটি কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়, একটি নিরাপত্তা প্রশ্ন। কিন্তু বাস্তবে গাজা হলো মানুষের জীবন, মানুষের কান্না, মানুষের স্বপ্ন। সেখানে প্রতিটি সকাল শুরু হয় অনিশ্চয়তা নিয়ে, প্রতিটি রাত শেষ হয় বেঁচে থাকার প্রার্থনায়।

আজ বিশ্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু যুদ্ধ বন্ধ করা নয়; মানবতাকে বাঁচিয়ে রাখা। কারণ যদি একটি শিশুর কান্না, একটি মায়ের আর্তনাদ, একটি পরিবারের ধ্বংস আমাদের বিবেককে না নাড়া দেয়, তাহলে আমাদের সভ্যতার সমস্ত অর্জন অর্থহীন হয়ে পড়বে।

গাজা আমাদের সময়ের আয়না। সেই আয়নায় আমরা শুধু একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডকে দেখি না; আমরা দেখি মানবতার সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং শান্তির প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের পরীক্ষা।

ধ্বংসস্তূপের নিচে আজও গাজার মানুষ বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্ন শুধু তাদের নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি পরীক্ষা। প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে পারব, নাকি ইতিহাসের আরেকটি করুণ অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকব? 
গাজার সংকটকে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। তবুও বাস্তবতার নির্মমতা বোঝাতে কিছু সংখ্যা উল্লেখ করতেই হয়। কারণ এসব সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়; এগুলো মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও বেদনার প্রতিচ্ছবি। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭৩ হাজার ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষ। নিহতদের মধ্যে ২০ হাজারের বেশি শিশু রয়েছে, যারা কখনো বড় হওয়ার সুযোগই পায়নি।

গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ এক বা একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ১৮ থেকে ১৯ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র, তাঁবু কিংবা অস্থায়ী ক্যাম্পে জীবনযাপন করছে। বিস্তীর্ণ আবাসিক এলাকা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় অসংখ্য পরিবার আজও জানে না তারা কবে আবার নিজেদের ঘরে ফিরতে পারবে।

খাদ্য সংকট পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। প্রায় ১৬ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে, যার মধ্যে ৮ লাখের বেশি শিশু। অনেক পরিবার দিনের পর দিন পর্যাপ্ত খাবার ছাড়া জীবন কাটাচ্ছে। একই সঙ্গে নিরাপদ পানির সংকটও গভীর হয়েছে। গাজার ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ আজ ট্রাকে সরবরাহ করা পানির ওপর নির্ভরশীল।

স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। অধিকাংশ হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত অথবা সীমিত সক্ষমতায় চলছে। মানবিক সংস্থাগুলোর মতে, বর্তমানে গাজায় পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হাসপাতাল প্রায় নেই বললেই চলে। চিকিৎসকরা সীমিত সম্পদ নিয়ে প্রতিনিয়ত জীবন বাঁচানোর লড়াই করছেন।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বাস্তবতা শিশুদের ঘিরে। যুদ্ধের প্রথম দিকের হিসাবেই অন্তত ১৯ হাজার শিশু মা, বাবা অথবা উভয় অভিভাবককে হারিয়ে এতিম হয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ, মৃত্যু ও বাস্তুচ্যুতির কারণে গাজার প্রায় প্রতিটি শিশুই কোনো না কোনো মানসিক আঘাত বহন করছে। তাদের শৈশব আজ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।

গাজার পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়। ৭৩ হাজার মৃত্যুর পেছনে রয়েছে ৭৩ হাজার অসমাপ্ত গল্প। ২০ হাজার শিশুর মৃত্যুর পেছনে রয়েছে হাজারো অপূর্ণ স্বপ্ন। আর লাখো বাস্তুচ্যুত মানুষের চোখে আজও একটাই প্রশ্ন—কবে ফিরবে শান্তি, কবে ফিরবে ঘর?

এখন গাজার সংকট শুধু আবহাওয়ার কারণে নয়; দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে নানা বাধার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
এনআরসির প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৩৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এতে তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকা মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
প্রায় ৯৮৭ দিনের সংঘাতের পরও লাখো মানুষ স্থায়ী আবাসন থেকে বঞ্চিত। মানবিক সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, দ্রুত আশ্রয়সামগ্রী সরবরাহ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার না হলে গাজার চলমান মানবিক সংকট নতুন মাত্রা পেতে পারে। 

আর্কাইভ