প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
দেশের বাজারে আবারও বাড়ল সয়াবিন তেলের দাম। প্রতি লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়ে বোতলজাত সয়াবিন তেলের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৪ টাকা। কয়েক মাসের ব্যবধানেই দ্বিতীয় দফায় দাম বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ ভোক্তার মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ ভোজ্যতেল এমন একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, যার দাম বাড়লে শুধু রান্নাঘরের বাজেট নয়, সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ে।
বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের পর নতুন দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, আমদানি ব্যয় এবং দেশের বাজারের বিদ্যমান মূল্য পরিস্থিতিকে দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ব্যবসায়িক বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা মূল্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব যখন দেশের বাজারে দ্রুত প্রতিফলিত হয়, তখন দাম কমার ক্ষেত্রে একই গতি দেখা যায় কি না।
এর আগে চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৪ টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তার আগে দাম ছিল ১৯৫ টাকা। অর্থাৎ কয়েক মাসের মধ্যেই আবারও দাম বাড়ল। এভাবে ধাপে ধাপে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব পড়া অবশ্যম্ভাবী।
সয়াবিন তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কেবল একটি পণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বাসাবাড়ির রান্নার খরচ বাড়ার পাশাপাশি হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি, ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসা এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ ভোক্তার ওপরই গিয়ে পড়ে। ফলে একটি পণ্যের দাম বাড়লেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাজারে।
এ অবস্থায় সরকারের দায়িত্ব শুধু নতুন মূল্য ঘোষণা করা নয়; বরং ঘোষিত মূল্য বাস্তবে বাজারে কার্যকর হচ্ছে কি না, কোথাও অতিরিক্ত মুনাফা বা কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে কি না—সেটিও কঠোরভাবে নজরদারি করা। একই সঙ্গে আমদানি, পরিশোধন, পরিবহন, বিপণন ও খুচরা পর্যায়ে প্রকৃত ব্যয়ের কাঠামো স্বচ্ছ করা জরুরি। দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা যেমন ব্যাখ্যা করতে হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য কমলে দেশের বাজারেও তার সুফল দ্রুত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য ভোজ্যতেলের দাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে মানুষের আয় একই হারে বাড়ে না। ফলে প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধিই তাদের মাসিক বাজেটে নতুন চাপ তৈরি করে। এমন পরিস্থিতিতে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি সামাজিক সুরক্ষা ও জনস্বার্থেরও প্রশ্ন।
সরকারকে তাই ভোজ্যতেলের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার দিকে নজর দিতে হবে। প্রয়োজন হলে আমদানি ব্যবস্থাপনা, শুল্ক-কর কাঠামো, মজুত পরিস্থিতি ও বাজার প্রতিযোগিতা—সবকিছু নতুন করে পর্যালোচনা করা উচিত। একই সঙ্গে বাজারে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থাকলে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগও প্রয়োজন।
পাম অয়েলের দাম এবার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে—এটি কিছুটা স্বস্তির খবর। তবে শুধু একটি পণ্যের দাম অপরিবর্তিত রাখলেই বাজার পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক হয়ে ওঠে না। সামগ্রিক ভোজ্যতেল বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং সয়াবিন ও পাম—উভয় তেলের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখাই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারকদের লক্ষ্য।
ভোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাতে বারবার মূল্যবৃদ্ধি দেখতে চান না; তারা চান স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও স্থিতিশীল বাজার। ব্যবসায়ীদেরও যৌক্তিক মুনাফা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, কিন্তু সেই মুনাফার ভার যেন সীমিত আয়ের মানুষের কাঁধে অসহনীয়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া না হয়।
সয়াবিন তেলের নতুন দাম ২০৪ টাকা নির্ধারণের পর এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—এই মূল্যবৃদ্ধির পর বাজারে কোনো ধরনের অতিরিক্ত মূল্য আদায় বা কৃত্রিম সংকট যেন তৈরি না হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানি ব্যয়ের পরিস্থিতি অনুকূলে এলে দাম কমানোর বিষয়টিও দ্রুত বিবেচনায় নিতে হবে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং বাজার তদারকিতে কঠোরতা—দুটিই নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বাজারের প্রতিটি বাড়তি টাকা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের সংসার থেকেই আসে। ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত যতটা সহজ, সেই বাড়তি বোঝা বহন করা সাধারণ মানুষের জন্য ততটা সহজ নয়।