প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ০৫:০৪ পিএম
বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, গত দু’টি অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী দল যেভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, তা আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছে। সংসদে ভিন্নমত থাকা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এবং সেই ভিন্নমতের ভিত্তিতেই দেশের জন্য সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব।
সোমাবর (৩১ আগস্ট) জাতীয় সংসদে সফররত ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্ডা ক্রিস্টিনা ফিলিপের সঙ্গে বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
চিফ হুইপ বলেন, বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সমন্বয়ের যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, আইপিইউ প্রতিনিধিরা সেটি ইতিবাচকভাবে দেখেছেন। সংসদের সাম্প্রতিক কার্যক্রমে সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের যে চেষ্টা করছে, সেটিও তারা প্রশংসা করেছেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা এবং বিরোধীদলীয় নেতার পরস্পরের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ এবং কোলাকুলির বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের রাজনৈতিক সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করে।
চিফ হুইপ বলেন, সংসদীয় কমিটি গঠনসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার পথ খোলা রয়েছে। প্রয়োজন হলে সংসদের অধিবেশনের মেয়াদ একদিন বাড়িয়েও সংসদীয় কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিরোধী দল তাদের প্রস্তাব দিলে বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা করা হবে।
সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন করে সংবিধান লেখা নয়, বরং জুলাই সনদে যেসব সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বিদ্যমান সংবিধানের সংশোধনের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষেই বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ১০ বছরের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না, উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের মতো বিষয় সংবিধানেই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, জুলাই সনদে যেসব সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। সংবিধানের কোনো বিধান বাতিল বা সংশোধন করতে হলে সেটিও সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই করতে হবে।
৭০ অনুচ্ছেদ প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বা সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের মতো মৌলিক কয়েকটি বিষয় ছাড়া অনুচ্ছেদটি বাতিল করার প্রত্যাশা রয়েছে। জুলাই সনদের আলোকে এ বিষয়ে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চিফ হুইপ বলেন, সংসদে ভিন্নমত থাকাটাই স্বাভাবিক। কেউ কোনো বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করলে সেই মতের প্রতি সম্মান দেখানো এবং নিজের মত তুলে ধরার সুযোগ নিশ্চিত করাই গণতন্ত্রের মূল কথা। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব হলে তা করা হবে। আর সমঝোতা না হলেও সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা লাঠি বা কুড়াল দিয়ে কোনো সমস্যার সমাধান করতে চাই না। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে, সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে সমস্যার সমাধান করতে চাই।’
দেশে গণতন্ত্রের বর্তমান ধারাকে ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে চিফ হুইপ বলেন, দীর্ঘ সময় পর দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশ রেখে যাওয়ার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজসহ সবার দায়িত্ব রয়েছে।
আইপিইউ সেক্রেটারি জেনারেলের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় কার্যক্রমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উত্তম চর্চা কীভাবে আরও কার্যকরভাবে অনুসরণ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একইসঙ্গে নারীর ক্ষমতায়ন, সংসদে নারী প্রতিনিধিদের ভূমিকা এবং তরুণ সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের অগ্রগতি নিয়েও মতবিনিময় হয়। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে মতের ভিন্নতা থাকলেও তা সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
চিফ হুইপ বলেন, ‘মতের অমিল থাকাটাই সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। মতভেদের ওপর ভিত্তি করেই আমরা সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত নিতে পারি। এটাই সংসদের বেস্ট প্র্যাকটিস।’
তিনি বলেন, আইপিইউ বিশ্বজুড়ে সংসদগুলোর উত্তম চর্চাগুলো পর্যালোচনা করে এবং সংসদীয় কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও দক্ষ করার বিষয়ে সহযোগিতা করে। বাংলাদেশের সংসদও এ ধরনের উত্তম চর্চা গ্রহণের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে আগ্রহী।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দলের (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, আইপিইউ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের অতীতের নিপীড়ন, গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় আন্তর্জাতিক মহলে সঠিকভাবে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক মহলে ভুল তথ্য উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তাদের পক্ষ থেকে আইপিইউ প্রতিনিধিদের অবহিত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অতীতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং ছাত্রনেতারাও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার প্রকৃত চিত্র আন্তর্জাতিক মহলের কাছে তুলে ধরার উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত দু’টি বিল নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, বিল দু’টি সংসদে উত্থাপিত হয়েছে এবং সংসদ সদস্যদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়েছে সেগুলো পর্যালোচনা করার জন্য। সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে এসব বিল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
চিফ হুইপ বলেন, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও তা আলোচনার মাধ্যমে নিরসনের সুযোগ রয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কাউকে বাদ দিয়ে নয়, বরং সবাইকে সঙ্গে নিয়েই দেশের সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে।
সরকারি দলের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান ও মোছা. তাহসিনা রুশদীর এ সময় উপস্থিত ছিলেন।