• ঢাকা বৃহস্পতিবার
    ১৬ জুলাই, ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩

সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাঁচ বছরের মাল্টিপল ভিসা, পর্যটন কূটনীতিতে নতুন দিগন্ত

প্রকাশিত: জুলাই ১৬, ২০২৬, ১১:১০ পিএম

সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাঁচ বছরের মাল্টিপল ভিসা, পর্যটন কূটনীতিতে নতুন দিগন্ত

সৈয়দ আতিক

সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাঁচ বছর মেয়াদি মাল্টিপল-এন্ট্রি ভিজিট ভিসা চালুর সিদ্ধান্ত শুধু একটি নতুন ভিসা নীতি নয়; এটি বৈশ্বিক পর্যটন, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কূটনীতির এক সুপরিকল্পিত কৌশল। স্থানীয় স্পনসর বা গ্যারান্টার ছাড়াই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ভ্রমণের সুযোগ তৈরি করে দুবাই আবারও প্রমাণ করল, আধুনিক বিশ্বে ভিসানীতি কেবল সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়—এটি অর্থনীতি, ব্যবসা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শক্তিশালী হাতিয়ার।

প্রতিবার সর্বোচ্চ ৯০ দিন অবস্থান এবং প্রয়োজন হলে আরও ৯০ দিন বাড়ানোর সুযোগ আন্তর্জাতিক পর্যটক, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও ফ্রিল্যান্স পেশাজীবীদের জন্য বড় সুবিধা। বিশেষ করে যাঁরা বছরে একাধিকবার আমিরাতে যাতায়াত করেন, তাঁদের জন্য এই ব্যবস্থা সময়, অর্থ ও প্রশাসনিক জটিলতা—সবই কমাবে। একই সঙ্গে বারবার নতুন ভিসার আবেদন করার প্রয়োজনও থাকবে না।

তবে এই ভিসা উন্মুক্ত হলেও শর্তগুলো যথেষ্ট বাস্তবসম্মত। ন্যূনতম চার হাজার মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ব্যাংক ব্যালেন্স, স্বাস্থ্যবীমা এবং নিশ্চিত ফিরতি টিকিটের মতো শর্তগুলো নিশ্চিত করে যে আবেদনকারী প্রকৃত পর্যটক এবং নিজের ব্যয় বহনে সক্ষম। অর্থাৎ, দুবাই একদিকে যেমন ভ্রমণ সহজ করছে, অন্যদিকে অভিবাসন ব্যবস্থাপনাকেও দায়িত্বশীল রাখছে।

বিশ্বজুড়ে পর্যটনের জন্য এখন প্রতিযোগিতা তীব্র। যে দেশ যত সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ ভিসা সুবিধা দিচ্ছে, আন্তর্জাতিক পর্যটকেরা সেদিকেই বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন। দুবাই সেই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেই দীর্ঘমেয়াদি ভিসা নীতিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করেছে। পর্যটক শুধু হোটেলে থাকেন না; তাঁরা কেনাকাটা করেন, বিনিয়োগের সম্ভাবনা খোঁজেন, সম্মেলনে অংশ নেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক অবদান রাখেন। তাই সহজ ভিসা মানেই দীর্ঘমেয়াদে বড় অর্থনৈতিক সুফল।

বাংলাদেশের জন্যও এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ব্যবসা, চিকিৎসা, প্রদর্শনী, পর্যটন ও পারিবারিক কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাতায়াত করেন। নতুন এই ভিসা তাঁদের জন্য ভ্রমণ পরিকল্পনা সহজ করবে এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার সুযোগ সৃষ্টি করবে। তবে আবেদনকারীদের আর্থিক স্বচ্ছতা, সঠিক নথিপত্র এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্যও এখানে একটি শিক্ষা রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণে শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আধুনিক, সহজ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভিসা ব্যবস্থা। বিশ্বের বহু দেশ আজ ভিসা নীতিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখছে। বাংলাদেশও যদি পর্যটন শিল্পকে সত্যিকারের সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত করতে চায়, তবে ভিসা প্রক্রিয়া সরলীকরণ, অনলাইন সেবা সম্প্রসারণ এবং বিদেশি পর্যটকদের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

দুবাইয়ের পাঁচ বছরের মাল্টিপল-এন্ট্রি ভিসা দেখিয়ে দিল, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণে নয়; মানুষের যাতায়াতকে কতটা সহজ, নিরাপদ ও বিশ্বাসভিত্তিক করা যায়, তার ওপরও নির্ভর করবে। যে রাষ্ট্র বৈশ্বিক নাগরিককে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত, আগামী দিনের পর্যটন ও বিনিয়োগের মানচিত্রে নেতৃত্বও তার হাতেই থাকবে।

আর্কাইভ