প্রকাশিত: জুলাই ৩, ২০২৬, ১০:২২ পিএম
পৃথিবী ও মহাবিশ্বকে আমরা কতটুকু জানি? প্রশ্নটি যত সহজ মনে হয়, উত্তরটি ততটাই বিস্ময়কর। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বলছে, মহাবিশ্বের মোট ভর-শক্তির (mass-energy) মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ হলো সাধারণ বা দৃশ্যমান পদার্থ (ordinary matter)—যা দিয়ে নক্ষত্র, গ্রহ, মানুষ, গাছপালা, পানি, বাতাস, এমনকি আমাদের শরীরও তৈরি। বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশ গঠিত এমন দুটি উপাদানে, যাদের প্রকৃতি এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি—ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter) এবং ডার্ক এনার্জি (Dark Energy)।তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এই ৫ শতাংশ বলতে বোঝায় না যে আমরা পৃথিবী বা মহাকাশে থাকা সব কিছুর মাত্র ৫ শতাংশ “দেখতে” পাই। বরং এটি বোঝায়, মহাবিশ্বের মোট ভর-শক্তির মাত্র ৫ শতাংশ এমন পদার্থ দিয়ে তৈরি, যা আমরা পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে পারি।
মানুষের ইন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতা
আমরা মনে করি, যা দেখি, শুনি বা স্পর্শ করি, সেটাই বাস্তব। অথচ আমাদের চোখ মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশের আলো দেখতে পারে—যাকে বলা হয় Visible Spectrum। অথচ এর বাইরেও রয়েছে অবলোহিত (Infrared), অতিবেগুনি (Ultraviolet), এক্স-রে, গামা রশ্মি, মাইক্রোওয়েভ এবং রেডিও তরঙ্গ। এগুলোও আলো বা তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ, কিন্তু আমাদের চোখ সেগুলো দেখতে পারে না। একইভাবে মানুষের কানও নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে সক্ষম। অত্যন্ত নিম্ন কম্পাঙ্কের ইনফ্রাসাউন্ড কিংবা উচ্চ কম্পাঙ্কের আল্ট্রাসাউন্ড আমাদের শ্রবণসীমার বাইরে।অর্থাৎ, বাস্তবতার একটি ক্ষুদ্র অংশই আমাদের ইন্দ্রিয়ের নাগালে আসে।
সবকিছু কি তরঙ্গ?
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে বিষয়টি আরও আকর্ষণীয়। কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুযায়ী, ইলেকট্রন, প্রোটনসহ মৌলিক কণাগুলো কখনও কণার মতো, আবার কখনও তরঙ্গের মতো আচরণ করে। একে বলা হয় Wave-Particle Duality।
তবে “সবকিছুই শুধুই তরঙ্গ”—এমন বক্তব্য পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং বলা যায়, প্রকৃতির মৌলিক কণাগুলোর মধ্যে তরঙ্গধর্মী বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। এই আচরণই আধুনিক প্রযুক্তির ভিত্তি—সেমিকন্ডাক্টর, লেজার, এমআরআই থেকে শুরু করে কোয়ান্টাম কম্পিউটার পর্যন্ত।
প্রযুক্তি: অদৃশ্য জগতের জানালা
মানুষের ইন্দ্রিয় সীমিত হলেও প্রযুক্তি সেই সীমা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
অর্থাৎ, প্রযুক্তি আমাদের নতুন “ইন্দ্রিয়” দিয়েছে। আমরা চোখে না দেখেও, কানে না শুনেও মহাবিশ্বকে জানতে শিখেছি।
ডার্ক ম্যাটার: আছে, কিন্তু দেখা যায় না
ডার্ক ম্যাটার কোনো আলো নির্গত করে না, প্রতিফলিতও করে না। তাই এটি সরাসরি দেখা যায় না। কিন্তু এর মহাকর্ষীয় প্রভাব স্পষ্ট।
গ্যালাক্সিগুলো যে গতিতে ঘুরছে, তা কেবল দৃশ্যমান পদার্থ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। অতিরিক্ত অদৃশ্য ভরের উপস্থিতিই বিজ্ঞানীদের ডার্ক ম্যাটারের ধারণা দেয়। আজও পৃথিবীর কোনো পরীক্ষাগারে ডার্ক ম্যাটার সরাসরি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
ডার্ক এনার্জি: মহাবিশ্বের রহস্যময় শক্তি
১৯৯৮ সালে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ধীরে নয়, বরং ক্রমেই দ্রুত হচ্ছে। এই ত্বরিত সম্প্রসারণের পেছনে যে রহস্যময় শক্তি কাজ করছে, তাকে বলা হয় ডার্ক এনার্জি।
এটি কী, কোথা থেকে এসেছে বা এর প্রকৃতি কী—এসব প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর এখনও অজানা।

তাহলে কি ৯৫ শতাংশের বাইরেও কিছু আছে?
এখানেই বিজ্ঞানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর প্রশ্ন।ইতিহাস বলছে, মানুষ বহুবার ভেবেছে সে সবকিছু বুঝে ফেলেছে। কিন্তু প্রতিবারই নতুন আবিষ্কার সেই ধারণাকে বদলে দিয়েছে।
এক সময় পরমাণুকে অবিভাজ্য মনে করা হতো। পরে আবিষ্কৃত হলো ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন। এরপর এল কোয়ার্ক, নিউট্রিনো, হিগস বোসন। আজও বিজ্ঞানীরা নতুন কণার সন্ধান করছেন।
সুতরাং, বর্তমান বিজ্ঞানের বাইরে আরও অজানা কোনো বাস্তবতা, নতুন বল (force), নতুন মাত্রা (extra dimensions) কিংবা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের পদার্থবিদ্যা থাকতে পারে—এ সম্ভাবনা বিজ্ঞান উড়িয়ে দেয় না। তবে এগুলোর পক্ষে এখনও পর্যাপ্ত পরীক্ষামূলক প্রমাণ নেই।
বিজ্ঞানের সৌন্দর্য এখানেই
বিজ্ঞান কোনো চূড়ান্ত উত্তর দাবি করে না। বরং প্রতিটি উত্তরের সঙ্গে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।আজ যা অদৃশ্য, আগামী শতাব্দীর প্রযুক্তি হয়তো সেটিকেই দৃশ্যমান করে তুলবে। হয়তো আমরা এমন কোনো বাস্তবতার মুখোমুখি হব, যা আজ কল্পনারও বাইরে।
মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য সম্ভবত ডার্ক ম্যাটার বা ডার্ক এনার্জি নয়। সবচেয়ে বড় রহস্য হলো—আমরা এখনও জানি না, আমরা কতটা জানি না। আর সেই অজানার অনুসন্ধানই মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক অভিযাত্রা।