• ঢাকা সোমবার
    ১০ আগস্ট, ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
আলোচনা সভায় বক্তারা

আদিবাসীদের ভূমির অধিকার ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে

প্রকাশিত: আগস্ট ৯, ২০২৬, ১১:২৭ পিএম

আদিবাসীদের ভূমির অধিকার ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে

সিটি নিউজ ডেস্ক

আদিবাসীদের আত্মপরিচয়, ভূমির মালিকানা, ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার নিশ্চিত করতে সাংবিধানিক ও আইনগত স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাদের অভিযোগ, ভূমি দখল, উচ্ছেদ, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, বৈষম্য ও নারী নিপীড়নের কারণে দেশের পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের সামাজিক জীবন ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের ২৯ বছর পার হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তারা।

রোববার আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সেখানে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

আলোচনা সভায় আদিবাসী নেতা, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের সদস্য ও মানবাধিকারকর্মীরা বক্তব্য দেন। জাতিসংঘ এবারের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান: জীবন ও কল্যাণ সুরক্ষা’।

সভায় বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পক্ষ থেকে আট দফা দাবি তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, গত তিন দশক ধরে আদিবাসীরা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করে আসছেন। দেশে প্রায় ৪০ লাখের বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। তাদের ভাষা, পরিচয়, ভূমি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।

তিনি বলেন, উন্নয়নের নামে আদিবাসীদের ভূমি দখল ও উচ্ছেদ বন্ধ করতে হবে।

ভূমির অধিকার নিশ্চিতের দাবি

সাবেক সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সহসভাপতি উষাতন তালুকদার বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও আদিবাসীদের অনেক মৌলিক অধিকার পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

তিনি বলেন, আদিবাসীদের ভূমির ওপর প্রচলিত ‘সমষ্টিগত মালিকানা’ আইএলওর ১০৭ ও ১৬৯ নম্বর কনভেনশনে স্বীকৃত। বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আইএলও কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করলেও ১৬৯ নম্বর কনভেনশন অনুসমর্থন করেনি। ১০৭ নম্বর কনভেনশনের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং ১৬৯ নম্বর কনভেনশন অনুসমর্থনের উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাষ্ট্রের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু ২৯ বছর পেরিয়ে গেলেও চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরেও শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে- এটাই প্রত্যাশা।

‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে এবং তাদের নিজস্ব অধিকার, পরিচয় ও মর্যাদা রয়েছে- রাষ্ট্রকে তা স্বীকার করতে হবে। আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার অন্যতম প্রধান উপায় হলো তাঁদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তার স্বীকৃতি দেওয়া।

তিনি বলেন, আদিবাসীদের ভূমির ওপর তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সাংবিধানিক ও আইনগত স্বীকৃতি জরুরি।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল কাফি রতন বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরও দেশের আদিবাসীরা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। ১৯৭১ সালে বৈষম্যহীন ও সাম্যভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন হলেও সব জনগোষ্ঠীর অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, আদিবাসীদের স্বীকৃতি দিতে রাষ্ট্র যদি ভয় পায়, তাহলে তাদের ভূমির অধিকার ও অন্যান্য অধিকার নিশ্চিত হবে- এমন বিশ্বাস করা কঠিন। আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, আদিবাসীদের ভূমি দখল ও তাদের ভাষা-সংস্কৃতি বিলীন হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে বৈচিত্র্যময় রাখতে আদিবাসীদের ভূমি, সুপেয় পানি ও বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের আট দফা

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার অনুপস্থিতিতে তার লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পিসিজেএসএসের স্টাফ সদস্য ত্রিজিনাদ চাকমা।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, পাহাড় ও সমতলের অধিকাংশ আদিবাসী জনগোষ্ঠী এখনো অস্তিত্বের সংকটের মধ্যে রয়েছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও তারা ক্রমাগত ভূমি হারাচ্ছেন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছেন।

ফোরামের আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া; পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে রোডম্যাপ ঘোষণা; সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশন গঠন; আদিবাসীদের বিষয়ে বিকৃত, খণ্ডিত বা মিথ্যা তথ্য প্রচার বন্ধ করা; তাদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন বন্ধ ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার; জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক ঘোষণাপত্র ও আইএলওর ১৬৯ নম্বর কনভেনশন অনুসমর্থন এবং ১০৭ নম্বর কনভেনশন বাস্তবায়ন; রাষ্ট্রীয়ভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন এবং পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য ৫ শতাংশ সংরক্ষিত কোটা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা।

রাঙামাটিতেও চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে রোববার রাঙামাটিতেও আলোচনা সভা ও শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম পার্বত্যাঞ্চল শাখার আয়োজনে রাঙামাটি পৌরসভা প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, পাহাড়ের আদিবাসী জনগোষ্ঠী নানা ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়ে অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে তারা আরও পিছিয়ে পড়ছে।

বক্তারা বলেন, তিন দশকের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করা হলেও রাষ্ট্র এখনো আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেয়নি। বরং আদিবাসী পরিচয়কে নানা সময় বিচ্ছিন্নতাবাদী তকমা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের ২৯ বছর পেরিয়ে গেলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। এ পরিস্থিতি অনন্তকাল চলতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন বক্তারা।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জুম এসথেটিকস কাউন্সিলের সভাপতি ও শিক্ষাবিদ শিশির চাকমা। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম পার্বত্যাঞ্চল শাখার সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা।

বিশেষ অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য ফদাং তাং রান্দাল, আইনজীবী জুয়েল দেওয়ান, সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহসভাপতি থোয়াই অং মারমা, গিরিসুর শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি জয়তী চাকমা ইনু এবং আইনজীবী দীপন চাকমা। স্বাগত বক্তব্য দেন আদিবাসী দিবস উদ্‌যাপন কমিটির সদস্যসচিব ইন্টুমনি তালুকদার।

জাতীয় সম্পর্কিত আরও

আর্কাইভ