প্রকাশিত: জুলাই ১৭, ২০২৬, ০৯:০৪ পিএম
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা আবারও প্রমাণ করেছে, বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা এখনো কতটা ভঙ্গুর। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু আঞ্চলিক সংকট নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালি আবারও বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
বিশ্বে প্রতিদিন সমুদ্রপথে যে তেল পরিবহন হয়, তার প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে অতিক্রম করে। বিশেষ করে এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা এই সংকীর্ণ জলপথের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়, মুদ্রাস্ফীতি উসকে দেয় এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করে।

গত কয়েক দশকে উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজের বিকল্প তৈরির চেষ্টা করেছে। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি-ফুজাইরাহ পাইপলাইন কিংবা ইরানের গোরেহ-জাস্ক প্রকল্প—সবই সেই কৌশলের অংশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব অবকাঠামোর সম্মিলিত সক্ষমতা এখনো হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন পরিবাহিত প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেলের সমপরিমাণ নয়। অর্থাৎ বিকল্প আছে, কিন্তু তা পূর্ণাঙ্গ নয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বিকল্প রুটও নিরাপদ নয়। ইয়েমেনের হুথি হামলায় লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির ঝুঁকি যেমন বেড়েছে, তেমনি ইরাক, সিরিয়া কিংবা তুরস্ক হয়ে যাওয়া সম্ভাব্য পাইপলাইনগুলোও রাজনৈতিক অস্থিরতা, সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় দ্বন্দ্বের কারণে অনিশ্চয়তায় ভুগছে। ফলে হরমুজের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে বিশ্ব নতুন ধরনের ভূরাজনৈতিক নির্ভরতার মধ্যে প্রবেশ করছে।

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বিশ্ব কি একটি সংকট থেকে বের হয়ে আরেকটি সংকটের দিকে এগোচ্ছে?
হরমুজের গুরুত্ব কমানোর প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে যৌক্তিক। কোনো একটি রাষ্ট্র বা জলপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। তবে বিকল্প অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে সেই বিনিয়োগও কাঙ্ক্ষিত সুফল দেবে না। পাইপলাইন নির্মাণ তুলনামূলক সহজ; কিন্তু নিরাপত্তা, রাজনৈতিক আস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা অনেক বেশি কঠিন।

বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই সংকট বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি মানে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, শিল্প উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি পাবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ তৈরি হবে এবং শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির বোঝা সাধারণ মানুষের কাঁধেই এসে পড়বে। তাই হরমুজের উত্তেজনা আমাদের কাছে দূরের কোনো যুদ্ধ নয়; এটি আমাদের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
বিশ্ব এখন এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, যেখানে শুধু নতুন রপ্তানি রুট নির্মাণই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বহুমুখী জ্বালানি উৎস, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, আঞ্চলিক কূটনৈতিক সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার শক্তিশালী কাঠামো। কারণ একটি প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আরেকটি ভূরাজনৈতিক সংকটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না।
হরমুজ প্রণালি হয়তো ভবিষ্যতে একমাত্র জ্বালানি করিডর থাকবে না, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এর বিকল্পও এখনো পূর্ণাঙ্গ নয়। তাই সামরিক উত্তেজনার পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানই বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর পথ। পৃথিবীর অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ নয়, স্থিতিশীলতার ওপরই টিকে থাকে।