প্রকাশিত: মে ৯, ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের উত্তেজনা, অভিযোগ-প্রতিঅভিযোগ এবং অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও আলোচিত বিষয় হলো গুম, খুন, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ, যা সমাজে গভীর আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। সম্প্রতি রাজনৈতিক পর্যায়ে একটি বক্তব্যে এমন একটি রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে শিক্ষার পরিবেশ নিরাপদ হবে, নারী-পুরুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। একই সঙ্গে অতীতের ভয়ভীতি ও দমনমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান একটি নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলে ধরেছেন। তিনি এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে, নারী-পুরুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে এবং নাগরিকরা ভিন্নমত প্রকাশের পূর্ণ সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে তিনি অতীতের “ভয়ভীতি ও দমনমূলক রাজনীতি” থেকে বের হয়ে এসে একটি সহনশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এই ধরনের বক্তব্য বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রাষ্ট্র শুধু ক্ষমতার কাঠামো নয়; এটি নাগরিকের নিরাপত্তা, অধিকার এবং আস্থার ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন ধরে চলমান রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। গুম, খুন ও রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগগুলো সেই সংকটকে আরও গভীর করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছে।
একই সঙ্গে নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষা, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং আইনের শাসন—এই মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে জনগণ বাস্তব পরিবর্তন চায়। কিন্তু প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের ব্যবধান থাকলে রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সহনশীলতা এবং ভিন্নমতকে গ্রহণ করার সংস্কৃতি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে না উঠলে সহিংসতা ও বিভাজন থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়, এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনও অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্রকে যদি সত্যিকারের অর্থে জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত করতে হয়, তাহলে ভয়ভীতি ও প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি সহনশীল, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
আজকের সবচেয়ে বড় চাহিদা কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এমন একটি পরিবেশ যেখানে নাগরিক ভয় নয়, আস্থা নিয়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। গুম-খুনের অভিযোগ ও রাজনৈতিক অবিশ্বাসের অধ্যায় পেছনে ফেলে যদি সত্যিকার অর্থে একটি নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তোলা যায়, সেটিই হবে নতুন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন।