ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন মেগা প্রকল্পের আওতায় ৫ বছর ধরে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের কাজ করেছে। বর্ষার শুরুতেই মেগা প্রকল্পের পেখম তোলেনি। জলে ডুবেছে নগরী। 

প্রকল্পের কাজ চলাকালীন সময়ে জনদূর্ভোগে পড়ে ছিল নগরবাসী। ১১ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প উপকারে আসেনি নগরবাসীর। 

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মেগা প্রকল্পের আওতায় আন্ডারগ্রাউন্ড পাইপলাইন স্থাপনসহ ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করে সিটি করপোরেশন। সাড়ে ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে এ কাজ করা হয়। সম্প্রতি এক থেকে দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে নগরীর অলিগলি, রাস্তাঘাট ও হাটবাজার ডুবে গেছে। অনেকের বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে ঢুকেছে পানি। এতে দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী।

বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেও জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান না হওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী। তারা বলছেন, নগরীর বৃষ্টির পানি চারটি খালের মাধ্যমে সুতিয়া নদীতে যাওয়ার কথা। কিন্তু খালগুলো খনন না করায় শহরের পানি সহজে বের হতে পারে না বলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। পাঁচ বছর ধরে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করেছিল সিটি করপোরেশন। তাহলে ১১ কোটি টাকার বরাদ্দ কোন কাজে ব্যয় করেছে তারা।



খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর মুন্সিবাড়ি, নাটক ঘরলেন, সিকে ঘোষ রোড ও পুরহিত পাড়ার ড্রেনের পানি সেহড়া খালের মাধ্যমে সুতিয়া নদীতে যাওয়ার কথা। অপরদিকে নগরীর বিদ্যাময়ী স্কুলের আশপাশের পানি নওমহল হয়ে মাকড়জানি খালের মাধ্যমে আকোয়া খাল হয়ে সুতিয়া নদীতে যাওয়ার কথা। কলেজ রোড, কাচিজুলি ও স্টেডিয়াম এলাকার বৃষ্টির পানি গোয়ালকান্দি খালের মাধ্যমে আকুয়া খাল হয়ে সুতিয়া নদীতে যাওয়ার কথা। এছাড়া নগরীর রহমতপুরসহ আশপাশের জলাবদ্ধতার পানি বগামারি খাল হয়ে আকুয়া খালের মাধ্যমে সুতিয়া নদীতে যাওয়ার কথা। কিন্তু চার খাল দখল ও খনন না করায় বৃষ্টির পানি সুতিয়া নদীতে যেতে পারছে না। এ কারণে অল্প বৃষ্টিতেই নগরী ডুবে যায়।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মেগা প্রকল্পের আওতায় আন্ডারগ্রাউন্ড পাইপলাইনসহ ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করা হয়। এতে ব্যয় হয় সাড়ে ১১ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় নগরীতে বড় বড় পাইপ বসানোর মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু খালগুলো খনন করা হয়নি। এ জন্য উন্নয়নকাজের সুফল পাচ্ছেন না নগরবাসী। তবে সিটি করপোরেশন নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে খালগুলো খনন এবং ড্রেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। এরপরও কেন জলাবদ্ধতা নিরসন হচ্ছে না সে বিষয়ে কিছুই জানাননি প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

নগরীর চরপাড়া এলাকার বাসিন্দা কামাল বলেন, ‘আধাঘণ্টার বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। অলিগলি ও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে যায়। সারাদিনেও পানি নামে না। মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।’

নগরীর মুন্সিবাড়ির বাসিন্দা রমজান আলী বলেন, ‘বরাদ্দের টাকা যথাযথ কাজে ব্যয় করছে না সিটি করপোরেশন। ড্রেনেজ ও খাল খননের নামে অর্থ লুটপাট করা হয়। খালগুলো ময়লায় ভরাট থাকায় বৃষ্টির পানি নামে না। ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’ 

সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিদর্শক মোহাম্মদ মহব্বত আলী বলেন, ‘গত অর্থবছরে নগরীর খাল খনন ও ড্রেনেজ পরিষ্কার বাবদ প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে এক কোটি ২০ লাখ টাকা। আমরা যথাযথ কাজে অর্থ ব্যয় করছি।’ 

সিটি করপোরেশনের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘বড় প্রকল্প হাতে নিয়ে খাল দখলমুক্ত ও খনন পরিকল্পিতভাবে করা গেলে জলাবদ্ধতা কমে যাবে। এ বিষয়ে সবার সহযোগিতা নিয়ে মেয়র উদ্যোগ নিলে দুর্ভোগ কেটে যাবে।

সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী মো. আজাহার আলী বলেন, ‘মেগা প্রকল্পের আওতায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে গত ডিসেম্বরে ড্রেনেজ উন্নয়নের কাজ সম্পন্ন করা হয়। এ কাজ সম্পন্ন করতে পাঁচ বছর লেগেছিল। কিন্তু খালগুলো সরু হয়ে যাওয়ায় এবং বিশেষ করে সুতিয়া নদীতে পানি প্রবাহ তেমন একটা না থাকায় ড্রেনের পানি দ্রুত সরতে পারে না। এ কারণে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে দুর্ভোগে পড়ছে নগরবাসী।’

ময়মনসিংহ নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার নুরুল আমিন কালাম বলেন, ‘নগরীতে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। অল্প বৃষ্টিতেই নগরী ডুবে যায়। জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগ নিয়ে খালগুলো উদ্ধারসহ পরিকল্পিতভাবে খননের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য দরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং সবার আন্তরিক প্রচেষ্টা। জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশন উদ্যোগ নেবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’

সিটি করপোরেশনের মেয়র ইকরামুল হক টিটু  বলেন, ‘আগের অর্থ ঠিকমতো ব্যয় করা হয়েছে। নতুন করে সিটি করপোরেশন এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ সড়কের উন্নয়নে ১৫৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। সম্প্রতি এই বরাদ্দ একনেকের সভায় অনুমোদন করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়ার পর প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’




সাজেদ/