আগাম নির্বাচনের দাবিতে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চের ঘোষণা দিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। বুধবার (২৫ মে) নেতাকর্মীদের বিশাল বহর নিয়ে তিনি ইসলামাবাদে পৌঁছান। এতে ব্যাপক পুলিশি ধরপাকড়ের মুখে পড়তে হয়েছে তার দলের সমর্থকদের।

দেখা যাচ্ছে, ইমরান খানের ওপর সরকার যেমন কঠোর হচ্ছে, আবার বিপরীতে তিনিও চুল পরিমাণ ছাড় দিতে অনিচ্ছুক। এতে পাকিস্তানে অগণতান্ত্রিক শক্তির হস্তক্ষেপের পথ সুগম হচ্ছে বলে দেশটির শীর্ষ ইংরেজি দৈনিক ডনের সম্পাদকীয় বলছে। পত্রিকাটির বুধবারের (২৫ মে) সম্পাদকীয় হুবহু অনুবাদ করে দেওয়া হলো:

গত এপ্রিলে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতাচ্যুত হন ইমরান। তারপর থেকেই নতুন নির্বাচনের দাবিতে তার সমর্থকরা নানা সময়ে মিছিল-সমাবশে করছেন। পাকিস্তানে ভীতি ছড়ানোর কৌশল অতীতে কাজে আসেনি। এ সময়েও তা কাজে আসার শঙ্কা নেই।

ইসলামাবাদমুখী লংমার্চের আগে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের গণগ্রেফতারে সরকারি সংস্থাগুলোকে ব্যবহারের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তে কেবল রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অবনতি ঘটবে। এমন এক সময় এই ভয় দেখানো হচ্ছে, যখন পাকিস্তানে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে।

সহিংসতা ছড়িয়ে দিয়ে পিটিআইয়ের পুনর্জাগরণ ঠেকিয়ে মাঠ দখলে নেওয়া সহজ হবে—ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) এমনটা কেন মনে করছে, তা বুঝে আসছে না।

প্রথমে নির্বিঘ্নে লংমার্চ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার আভাস এসেছিল। কিন্তু সোমবারের একটি বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও লন্ডন থেকে তার বড় ভাই নওয়াজ শরিফ অংশ নেওয়ার পর নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। লংমার্চ নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তে কঠোরতা এসেছে।

খবর অনুসারে পিএমএল বলছে, আগাম নির্বাচন হবে কিনা; সেই সিদ্ধান্ত ইমরান খানের নির্দেশনা অনুসারে নেওয়া হবে না। পিটিআইয়ের বিক্ষোভ দমনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহকে পুরিপূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা পেয়েই সোমবার দিন শেষে পুলিশ বাহিনীকে পিটিআইয়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বাড়িতে অভিযান পরিচালনা ও তাদের গ্রেফতারের হুকুম দেন তিনি।

সামাজিকমাধ্যমে পোস্ট করা পুলিশের পদক্ষেপের ভিডিও ও ছবিতে ব্যাপক নিন্দা এবং ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বুধবার দিন চলে গেলেও সরকার কিংবা পিটিআইয়ের মধ্যে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এসে পদক্ষেপগুলোকে নতুন করে পর্যালোচনার সদিচ্ছার দেখা যায়নি। তারা পরস্পরকে ছাড় দিতে নারাজ।



সরকারের মিত্রদের পাশে নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পিটিআইকে কঠোরভাবে মোকাবিলার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন রানা সানাউল্লাহ। বাহুল্যবর্জিত বক্তব্যে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসলামাবাদে লংমার্চের অনুমোদন নেই পিটিআইয়ের। কোনোভাবেই তাদের রাজধানীতে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।


পিটিআইয়ের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করার অধিকার অস্বীকার করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের শঙ্কা রয়েছে। দেশটিতে ২০১৪ সালে সরকারবিরোধী রক্তাক্ত বিক্ষোভের সময়ও একই ঘটনা ঘটেছিল।

একই সময়ে, নিজের সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময়ে পরিস্থিতির আরও অবনতির আগে আগাম নির্বাচন দিতে সরকারকে চাপ দিতে বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইমরান খান। আর ইসলামাবাদমুখী লংমার্চের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকার কথাও জানিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।

সরকার ও পুলিশের দমনপীড়নে ভীত না-হতে সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তারা আর কতজনকে গ্রেফতার করতে পারবে বলেও তিনি প্রশ্ন রাখেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের শঙ্কা—সরকার ও পিটিআইয়ের ক্ষমতার লড়াই আরও তিক্ততার দিকে যাচ্ছে। দেশটির অস্থিতিশীল রাজনীতিও আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আর নিয়ন্ত্রণহীন এই অস্থিরতার জন্য দুপক্ষই সমানভাবে দায়ী।

ইমরান খানকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসার পর বড় বড় চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সরকার অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের সমালোচনার মুখে পড়েছে তারা। আবার তাদের ব্যর্থতায় পিটিআইও নতুন গতিশক্তি পেয়েছে।

মনে হচ্ছে, রাজনীতির মাঠে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিরোধীদের দমনে বলপ্রয়োগেও আপত্তি নেই পিএমএল-নওয়াজের।

আর রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছেন পিটিআইপ্রধান। এতে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। দেশকে যতোই খেসারত দিতে হোক না কেন; এক ইঞ্চি ছাড় দিতে রাজি না তিনি।

রাজনৈতিক নেতারা যখন পরস্পরের বিরুদ্ধে লেগে আছেন, তখন তাতে ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক কোনো আভাস মিলছে না। এতে অগণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপের পথ সুগম হচ্ছে। সবাইকেই চড়া মূল্য চোকাতে হবে।


সাজেদ/