প্রকাশিত: জুন ২৭, ২০২৬, ১০:২৭ পিএম
গাজা উপত্যকায় চলছে উচ্চমাধ্যমিক সমমানের ‘তাজউইহি’ পরীক্ষা। তাই আঠারো বছর বয়সি ফিলিস্তিনি তরুণী দানা শাবাতের জীবনের সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সপ্তাহটি এখন কাটছে। দানা চিরকালই একজন কৃতী শিক্ষার্থী, স্কুলের পরীক্ষায় তার প্রাপ্ত নম্বরের গড় কখনোই ৯৯ শতাংশের নিচে নামেনি। কিন্তু এবারের পরীক্ষাটি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা, যা একই সাথে তার জীবনে বয়ে এনেছে চরম উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা।
দানা স্বপ্ন দেখেন ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞান, ফিন্যান্স বা ব্যবসায় প্রশাসন নিয়ে পড়াশোনা করার। একটি বৈদেশিক স্কলারশিপ পেয়ে গাজার এই দুঃসহ বন্দিজীবন থেকে দূরে নিজের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই এখন তার একমাত্র লক্ষ্য।
বিগত আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরাইলি আগ্রাসনের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছে দানা। গত বছরের মে মাসে এক ইসরাইলি বিমান হামলায় সে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও প্রাণ হারান তার মা লিনা শাবাত। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় নিহত হওয়া ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনির একজন দানার মা।
উত্তর গাজার বেইত হ্যানুন এলাকায় একসময় সুন্দর ঘরবাড়ি আর স্থিতিশীল জীবন ছিল তাদের। কিন্তু ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় পুরো এলাকা মাটির সাথে মিশে যাওয়ার পর এখন মধ্য গাজার দের আল-বালাহ-র একটি শরণার্থী তাঁবুতে উদ্বাস্তু জীবন কাটাচ্ছে দানার পরিবার।
গাজার অধিকাংশ স্কুল ইসরাইলি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে অথবা বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ফলে দানাকে সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে অনলাইনের মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছে। চলমান তাজউইহি পরীক্ষাও এর ব্যতিক্রম নয়। পরীক্ষার এই দিনগুলোতে প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম থেকে ওঠে দানা। এরপর বাবার সাথে এক ঘণ্টা পায়ে হেঁটে পৌঁছায় এমন একটি ক্যাফেতে, যেখানে অন্তত পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ইন্টারনেট সংযোগ এবং বিদ্যুতের ব্যবস্থা পাওয়া যাবে। নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটি একটি ক্যাফেতে বসে মোবাইলের স্ক্রিনে দিতে হবে, তা কখনো কল্পনাও করেনি দানা। দীর্ঘ তিন বছর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় এবং ইউটিউব ভিডিওর সহায়তায় প্রতিটি বিষয়ের প্রস্তুতি নিয়েছে সে।
চলতি বছর গাজার প্রায় ৩৭ হাজার শিক্ষার্থী এই তাজউইহি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে পশ্চিম তীরের শিক্ষার্থীরা স্কুল এবং পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে সরাসরি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পেলেও, গাজার শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ পরীক্ষা দিতে হচ্ছে অনলাইনে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে।
শনিবার (২৭ জুন) দানার পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষা ছিল। সকাল নয়টায় পরীক্ষা শুরুর আগেই ক্যাফেতে ভিড় জমায় ডজন ডজন শিক্ষার্থী। টেবিলে মোবাইল ফোন সামনে নিয়ে অধীর আগ্রহে তারা অপেক্ষা করতে থাকে অনলাইন পোর্টালটি খোলার। বাইরে অন্য অভিভাবকদের সাথে চিন্তিত মুখে অপেক্ষা করছিলেন দানার বাবা মুহান্না শাবাত, যিনি যুদ্ধের আগে নিজে একজন রসায়নের শিক্ষক ছিলেন। মেয়ের পড়াশোনা সচল রাখতে ঘরের অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ বাঁচিয়ে তিনি গৃহশিক্ষকের ব্যবস্থা করেছিলেন।
যুদ্ধ তাদের জীবনের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। মুহান্না আক্ষেপ করে জানান, তার স্ত্রী বেঁচে থাকলে মেয়েদের এই দশা দেখে ভেঙে পড়তেন। মায়ের মৃত্যুর পর থেকে সংসার এবং তিন ছোট বোনের দেখভালের দায়িত্ব এখন বড় বোন হালা এবং দানার কাঁধে। মাত্র তিন বছর বয়সি ছোট বোন আলমা সেই হামলায় নিজের ডান চোখটি হারিয়েছে। মা সবসময় চাইতেন মেয়েরা যেন রান্নাবান্নার পেছনে সময় নষ্ট না করে কেবল পড়াশোনায় মনোযোগ দেয়। মায়ের সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতেই চরম প্রতিকূলতার মাঝেও লড়ে যাচ্ছে দানা।
দুই ঘণ্টার পরীক্ষা শেষে ক্যাফে থেকে হাসিমুখে বেরিয়ে আসে দানা। বাবাকে আশ্বস্ত করে সে জানায়, পদার্থবিজ্ঞানের পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে এবং এবার ইন্টারনেট সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়নি। তবে পরীক্ষা শেষ হলেও বিশ্রামের সুযোগ নেই দানার। তাঁবুতে ফিরে পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নিজের এবং বাবার মোবাইল ফোনটি চার্জ দিতে পাঠাতে হয় একটি চার্জিং স্টেশনে, কারণ তাঁবুতে কোনো বিদ্যুৎ নেই।
যুদ্ধবিরতির আট মাস পেরিয়ে গেলেও গাজা পুনর্গঠনের কোনো লক্ষণ নেই, মাঝেমধ্যেই চলছে বিচ্ছিন্ন ইসরাইলি হামলা। বেইত হ্যানুনে নিজেদের ভিটেমাটিতে আদৌ কখনো ফিরতে পারবে কিনা তাও জানা নেই দানার। তবে সব হারিয়েও দানা স্বপ্ন দেখে একজন সফল মানুষ হওয়ার, যে সমাজের জন্য অবদান রাখবে। মা যেভাবে তাকে দেখতে চেয়েছিলেন, ঠিক সেই উচ্চতায় পৌঁছে মায়ের আত্মাকে শান্তি দেওয়াই এখন এই যুদ্ধজয়ী তরুণীর একমাত্র ব্রত।