মঙ্গলবার   ১১:০১ অপরাহ্ন
১৮ই জানুয়ারি, ২০২২  |  ৫ই মাঘ, ১৪২৮  |  ১৫ই জমাদিউস-সানি, ১৪৪৩ পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
লগইন
সর্বশেষ

Loading...

সেই দিনগুলো খুঁজে ফেরা

সোনামাখা-দিনগুলো

সোনামাখা-দিনগুলো

আমার বাড়ি যাইও বন্ধু বসতে দিবো পিঁড়া/ জলপান করতে দিবো শালি ধানের চিঁড়া/ শালি ধানের চিঁড়ারে ভাই বিন্নি থানের খই/ বাড়ির গাছের সবরি কলা গামছা বান্ধা দই। আর বিন্নি ধানের খই এখন কি কেউ চেনে? মুড়ি-মুড়কি। দাঁড়িয়াবান্ধা খেলা। মাটির ওপর দাগ দিয়ে চকাচল। গাছের মগডাল থেকে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়া। খাবার থালায় মাছের ঝোল। ক্ষেত থেকে তুলে এনে পাটশাকের চচ্চড়ি। সজনে ডাল। বাড়ির উঠানে বসে অড়হর ডাল ভাজা খাওয়া। এসব এখন খুব একটা চোখে পড়ে না।


সরিষা তেলে ডিম ভাজা কেউ কি খেয়েছেন? এসব এখনকার ছেলেমেয়েরা চেনে না। দাদা-দাদিরা খেতেন করলা ভাজি, চোখ ঠাণ্ডা রাখার জন্য বছরে একবার হলেও দিতেন শামুকের ঠাণ্ডা জল। এটাই হলো হাজার বছরের বাঙালিয়ানার বর্ণাঢ্য ঐতিহ্য। এভাবেই সেই সময়ের মানুষ ভালো থাকার চেষ্টা করতেন। তখন ছিল গোলাভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, গোয়ালে ছিল দুধেল গাভী।


হারিয়ে যাওয়া সেই সময়ের গ্রামগঞ্জে হতো হা-ডু-ডু খেলার প্রতিযোগিতা। দাঁড়িয়াবান্ধা, সাঁতার। ছিল লুকোচুরি-কানামাছি খেলা। চৈত্রে নদীর পাড়ে বসত বান্নী (বাড়নি) সেখানে পাওয়া যেত লাল গুড়ের জিলাপি, গুড়ে মাখা খই-মুড়ি। এসব আজ কল্পনার অতীত হয়ে গেছে। গ্রামের মেলায় পাওয়া যেত কুসাইর (আখ), হাতের পাখা, ভটভটি গাড়ি, তালপাতার বাঁশি। শোনা যেত বাঁশের বাঁশিতে ভাওয়াইয়া গানের সুর।


বৈশাখী মেলা বসত খোলা জায়গায়। সেখানে ধুলো উড়ত। এর মধ্যে চলত লাঠিখেলা। কোথাও কড়ি খেলা, ছিল ঘোড়দৌড়। সার্কাস কিংবা যাত্রাগানের রাত ছিল। পুতুল নাচ, নাগরদোলা, শহর থেকে আসত বাইস্কোপ। ডুগডুগি বাজিয়ে দেখাত- ‘তারা বিবি চলে এলো, একি মজা দেখা গেল, হলদি বাড়ির মেয়ে এলো, পান খেয়ে মুখ লাল করিল।এক পয়সা এবং দুই পয়সা দিয়ে এই বাইস্কোপ দেখত গ্রামের সহজ-সরল মানুষ। দিনটার জন্য অপেক্ষা করত গ্রামের মানুষ প্রতিদিন। বিনোদনের প্রধান বিষয় হয়ে উঠত দিনটি। মোটরসাইকেল খেলা হতো বিশাল এক কুয়ায়। অনেকে বলতেন মরণকূপ। কুয়ায় মোটরসাইকেল খেলা দেখতেন সবাই।


সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার সময় ছোটদের হাতে খেলনা, মৃৎশিল্পের সামগ্রী, খই-মুড়ি, আর কদমা, বাতাসা, মিষ্টিসহ আরও অনেক গ্রাম্য খাবার দেখা যেত। আজ সেই মেলা বসে না কোথাও। ইটপাথরের সভ্যতায় মিলিয়ে গেছে সব আনন্দ। শহর গিলে খেয়েছে গ্রামকে। সোডা পানির বোতল নেই। লাল-সাদা আইসক্রিম চোখে পড়ে না। বিজ্ঞানের যুগে হারিয়ে যাচ্ছে দোয়েল এবং ছোট ছোট পাখি। বিতাড়িত হয়ে ছোট পাখিগুলো মরে যাচ্ছে- এমনই বলেন বিশেষজ্ঞরা। তা নাহলে দোয়েল ডাক কমে গেল কেন? ঝাড়-জঙ্গল নেই।


কাঁচা রাস্তা এখন ইটপাথরে ঢেকে দেয়া হয়েছে। সারাক্ষণ লাল-সাদা বাতি। অথচ তখন ছিল গরুর গাড়ি, পালকি। এখন ঘোড়াও নেই, ঘোড়ার গাড়িও নেই। গাড়িয়ান ভাইয়ের গান এখন আর শোনা যায় না। গরুর গলায় বাজত ঘণ্টা- সেটাও এখন আর নেই।

অথচ বিয়েবাড়িতে যাওয়া হতো গরুর গাড়িতে। সারিবদ্ধ গাড়ির ওপর বাঁশের ছই। পালকিতে থাকতেন নতুন বউ। এটাই ছিল তখনকার একমাত্র বাহন। এটাই ছিল আনন্দের। ওই সময় ভাত খেতাম কলার পাতায়। মাটিতে বসে খড়ের ওপর। ছিল কিছু গ্রাম্য খেলা। যেমন- সাইকেলের চাকা চালানো, মার্বেল খেলা, জাম্বুরা দিয়ে বল খেলা।


চৈত্রসংক্রান্তিতে পশুপাখি শিকার করা ছিল একটা সংস্কৃতি। রাত হলে চড়ুইভাতির আয়োজন ছিল আর একটা খেলা। সবার বাড়ি থেকে চাল, লবণ, সবজি, ডিম, মুরগি এনে এটা করা হতো। এটাই ছিল গ্রামবাংলার অলিখিত নিয়ম। গ্রামে পালাগান, কবিগান, বাড়িতে বসে পাঠ করা হতো পুঁথি। কখনও বিষাদসিন্ধু। সবাই শুনতেন বিষাদ সিন্ধুর সেই করুণ কাহিনি।


দেখা যেত সন্ন্যাসী। হলুদ ধুতি পরে থাকতেন। মাথার চুল জট বাঁধানো। ছিলেন গোয়ালি। এদের কাজ হলো বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ভিক্ষা করা। গোয়ালঘরে বসে ঠুমরি বাজিয়ে তারা সত্যবাণী উপদেশমূলক কীর্তন গাইতেন। এখন আর ওদের দেখা যায় না। গ্রামের মানুষ ছিল একেবারে সাধারণ-সাদামাটা। পুলিশ ভয় করতেন তারা। সে সময় ঝগড়া-বিবাদ হতোই না।


গ্রামের মানুষ বয়স্কদের দেখলে মাথা নত করে যেত। গ্রামের মহিলাদের মাথার কাপড় তোলা থাকত। পরপুরুষের সামনে এসে কথা বলতেন না। একটা নিয়মের মধ্যে ছিলেন তারা। সব পরিবার এবং প্রতিটি ঘরে হতো চিঁড়া-মুড়ি, নানা রঙের পিঠা। ধান ভানা হতো ঢেঁকিতে। তখন বিদ্যুৎ ছিল না। ছিল কেরোসিন তেলে জ্বালাতে হতো মাটির পিদিম হারিকেন। হ্যাজাকের বাতি এসেছে অনেক পরে। সয়াবিনের তেল তখন ছিল না। ক্ষেতের সরিষা ভাঙা তেলই ছিল একমাত্র তরকারি রান্নার প্রধান উপকরণ। সরিষা ভাঙা হতো ঘানিতে। ঘানি ঘুরত চারদিকে। আর ঘোরাত গরু। ঘোরার সময় গরুর চোখ বেঁধে দেয়া হতো। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি ঘুরত। আর মধ্যখানে কাঠের বাক্সে সরিষা থাকত। সরিষাগুলো পিষে বের হতো খাঁটি সরিষার তেল। এখন আর সেই ঘানি চোখে পড়ে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও দু-একটা চোখে পড়ে।


শহর থেকে অনেক দূরের গ্রামগুলোতে। এখন ছোট নদী নেই। মাঠের তাজা ফল নেই। গাছে উঠে খেতে দেখি না দস্যি ছেলেদের আম-কাঁঠাল। মধুময় দিনগুলো আজ হারিয়ে গেছে। এখন আর টিনের চালে বৃষ্টির শব্দে বর্ষার গান শোনা যায় না। ব্যাঙের ডাক, সেটাও রূপকথার গল্প। সোনামাখা আজ হয়ে গেছে ছেলেভোলানো শখের হাট।

নূর/এম. জামান