শনিবার   ০২:১০ পূর্বাহ্ন
২৩শে অক্টোবর, ২০২১  |  ৮ই কার্তিক, ১৪২৮  |  ১৭ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪৩ পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
লগইন
সর্বশেষ

Loading...

বাংলাদেশে সিরোসিসের প্রধান কারণ

বাংলাদেশে সিরোসিস এর প্রধান কারণ

বাংলাদেশে সিরোসিস এর প্রধান কারণ

সিরোসিস শব্দটি প্রথম বর্ণনা করেন বিখ্যাত ফরাসি বিজ্ঞানী ডা. রিনে লেনেক ১৮১৯ সালে। শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ কিরাস (Kirrhos) থেকে। যার শাব্দিক অর্থ তামাটে হলুদ অমসৃণ রঙ যা লিভারের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহে রোগীর শরীরে দেখা যায়।

আমরা জানি, যকৃত বা লিভার হলো মানুষের শরীরের একটি অতি প্রয়োজনীয় অঙ্গ। পিত্ত নিঃসরণের মাধ্যমে খাবার হজম হতে শুরু করে শরীরের যাবতীয় বিপাকীয় কার্যাবলি এর দ্বারা সম্পাদিত হয়। ফলে লিভারের অসুস্থতার ফলাফল হয় ব্যাপক ভয়াবহ। অনেক রকম কারণে লিভার সিরোসিস হতে পারে। তবে কারণ যাই হোক ন্যূনতম ছয় মাসব্যাপী প্রদাহ না হলে লিভারের স্বাভাবিক কাঠামোর পরিবর্তন হয় না। লিভার সিরোসিস হতে সময় লাগে কমপক্ষে -১০ বছর।

বাংলাদেশে সিরোসিসের প্রধান কারণ শরীরে হেপাটাইটিসবিভাইরাসের সংক্রমণ। এ ছাড়া আরও কারণ রয়েছে-

) হেপাটাইটিসসিভাইরাস সংক্রমণ;

) লিভারের অতিরিক্ত চর্বি;

) অতিরিক্ত মদপান;

) ইমিউনোলজিক্যাল রোগ : অটোইমিউন লিভার ডিজিজ;

) প্রাইমারি বিলিয়ারি সিরোসিস;

) জেনেটিক/বংশানুক্রমিক রোগ, যেমন- হেমোক্রমাটোসিস, উইলসন্স ডিজিজ;

) অজ্ঞাত কারণসমূহ।

রোগীরা যদি ন্যূনতম ছয় মাস বা তার বেশিদিন এই কারণসমূহে আক্রান্ত থাকে তাহলে লিভারে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ হয়ে সিরোসিসে রূপান্তরিত হয়। এই রোগের শুরুতে কোনো উপসর্গ থাকে না বললেই চলে। তবে আস্তে আস্তে রোগী শারীরিক দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা, পেট ফাঁপা, হজমে অনিয়ম এরূপ নানাবিধ সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো অসুখটি অনেকটা অগ্রসর না হওয়া পর্যন্ত আসক্ত রোগীর কোনো শারীরিক সমস্যা বা রোগের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।

লিভার সিরোসিসকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথমত- Compensated Cirrhosis এই রোগীরা সিরোসিস অবস্থায় স্বাভাবিক মানুষের মতো কোনো সমস্যা ছাড়া অথবা রক্তবমি বা কালো পায়খানার সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের নিকট আসেন। নিয়মিত শারীরিক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় এদের অধিকাংশের সিরোসিস ধরা পড়ে।

দ্বিতীয়ত-Decompensated Cirrhosis কিছু রোগী শরীরে পানি জমা অবস্থায়, জন্ডিস নিয়ে বা অজ্ঞান অবস্থায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। এরাই হলেন ডিকমপেনসেটেড সিরোসিসের রোগী।

সিরোসিস আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার জন্য কয়েকটি দিক লক্ষণীয়

. রোগ নির্ণয়;

. রোগের কারণ নির্ণয়;

. রোগের জন্য সৃষ্ট জটিলতা নির্ণয়;

. রোগীর বর্তমান অবস্থা;

চারটি বিষয়ের জন্য রোগীর বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার প্রয়োজন হয়। মূল চিকিৎসা এই দিকসমূহ বিবেচনায় রেখে করতে হয়। লিভারে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের ফলে রোগীরা ক্লান্ত পরিশ্রান্ত অবস্থা, শরীরে পানি, বমিভাব ইত্যাদি নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে আসেন। তবে অনেকে আসেন এমন অবস্থায় যে ইতোমধ্যে তার লিভারের ক্যান্সার হয়ে গেছে। অর্থাৎ রোগীরা সিরোসিস-পরবর্তী জটিলতা নিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। সিরোসিস-পরবর্তী রকম আরও কিছু জটিলতা হলো : গলার রক্তনালি মোটা হওয়া রক্তক্ষরণ, বারবার অজ্ঞান হওয়া, পেট শরীরে পানি জমা, জন্ডিস, কিডনির বিকলতা, প্রস্রাবে সমস্যা ইত্যাদি।

রোগ প্রতিরোধ এবং অগ্রসর হবার আগে রোগটি নির্ণয়ই হলো রোগ থেকে বাঁচার পূর্বশর্ত। যেহেতু হেপাটাইটিসবিভাইরাস সংক্রমণ বাংলাদেশে রোগের প্রধান কারণ, সেহেতু হেপাটাইটিসবি-এর সংক্রমণ প্রতিরোধ জরুরি। তাই হেপাটাইটিসবি-এর টিকা গ্রহণ, নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন, ডিসপোজেবল সুই ব্যবহার এবং ব্লেড, রেজর, ব্রাশ, ক্ষুর প্রভৃতি যেন বহুজনে ব্যবহার করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।

বিভাইরাসে আক্রান্ত মা গর্ভবতী হলে সন্তানের জন্মদানের সঙ্গে সঙ্গে দুরকম টিকা দেওয়া বাঞ্ছনীয়। ছাড়া পরিবারের একজন সিরোসিস আক্রান্ত হলে বাকি সদস্যদের উচিত রোগের কারণ অনুযায়ী লিভার ব্যাধি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা। উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও যতই নগরায়ন শিল্পায়ন হচ্ছে ততই বাড়ছে মদপান, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণ ফাস্টফুড কালচারের। ফলে সৃষ্ট অতিরিক্ত মেদ। যার কারণে লিভারে চর্বি জমার মাধ্যমে সিরোসিস হওয়ার পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে। তবে নিয়মিত জীবন খাদ্যাভ্যাস, নৈতিকতাবিরোধী কাজ পরিহার, পরিশ্রম ব্যায়াম এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই রোগ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। আর যারা রোগে আক্রান্ত তারা নিয়মিত লিভার ব্যাধি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আজীবন চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এর জন্য সৃষ্ট জটিলতাসমূহ হতে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারবেন। মনে রাখবেন সুশৃঙ্খল জীবন এবং নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসই পারে একজনকে সুস্থ রাখতে দীর্ঘজীবী করতে।

তারিক/এম. জামান/ডাকুয়া