শুক্রবার   ০৭:০৯ পূর্বাহ্ন
১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২১  |  ২রা আশ্বিন, ১৪২৮  |  ১০ই সফর, ১৪৪৩ পরীক্ষামূলক সম্প্রচার
লগইন
সর্বশেষ

Loading...

টাকার কাগুজে নোটের ব্যাপারে অসচেতন ব্যাংকাররা!

টাকারে কাগুজে নোটের ব্যাপারে অসচেতন ব্যাংকাররা! ৩

টাকারে কাগুজে নোটের ব্যাপারে অসচেতন ব্যাংকাররা! ৩

টাকার কাগুজে নোট যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য বেশ কিছু নির্দেশনা জারি রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মানছেন না ব্যাংকাররা। এই নির্দেশনা কার্যকর না হওয়ায় অতি অল্প সময়ে অপ্রচলনযোগ্য হয়ে পড়ছে নোটগুলো। দেখা যাচ্ছে টাকার নোটের বান্ডিলে স্ট্যাপলার পিন লাগানো হচ্ছে। ছাড়াও টাকার বান্ডিলের ওপরের নোটে হিসাব লিখছেন কিছু কিছু ব্যাংকার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, পিন লাগানোর কারণে নোটগুলো অতি অল্প সময়ে নষ্ট হয়ে যায়। তাই তারা বান্ডিলে পিন ব্যবহার করে না। অন্য ব্যাংকগুলোকেও পিন ব্যবহার না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সি ম্যানেজমেন্টের এক নির্দেশনায় অবশ্য দেখা যাচ্ছে এক হাজার টাকার নোটে স্ট্যাপলার পিন লাগানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলছেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন নতুন নোট বা বাজারে রি-ইস্যু করা যায় এমন কোনো টাকার প্যাকেট বা বান্ডিলে পিন মারে না। শুধুমাত্র যেসব নোট পুড়িয়ে ফেলতে হবে বা ফেলে দিতে হবে সেগুলোতে পিন মারা হয়। ছাড়া আর কোনো নোটে এখন পিন মারা হয় না। ব্যাংকগুলোকে এই চর্চা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


বাস্তবতা হলো বাজারে অনেক নোটেই ছিদ্র দেখা যায় এই পিনের কারণেই। এজন্য বিশেষ কিছু কারণের কথা বলেছেন মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন এমন কয়েকজন ব্যাংকার। তারা বলছেন, এটি ঠিক যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেক আগেই পিন মারা যাবে না বলে জানিয়েছে। কিন্তু কাজ করার সময় নানা কারণে অনেক কর্মকর্তা বান্ডিলে পিন থাকলেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। আর এসব কারণের একটি হলো নিজেকে ঝুঁকিমুক্ত রাখা।

তারা আরও বলেন, ধরুন আপনি ব্যাংক থেকে এক লাখ টাকা তুললেন এবং সব পাঁচশ টাকার নোট। নিয়ম হলোআপনি কাউন্টারেই প্রতিটি নোট চেক করে দেখবেন বলবেন যে সব ঠিক আছে কি-না। জাল বা ছেঁড়াফাড়া থাকলে ব্যাংক চেঞ্জ করে দেবে। কিন্তু এই পরীক্ষার সময় ভিড়ের কারণে কর্মকর্তা সবসময় তাকিয়ে থাকতে পারেন না সুযোগে মাঝে মধ্যে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। পিন থাকলে বলা হয় যে পিন খোলার আগেই নোট চেক করে জানাতে। ফলে এটি একটি নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করছে।

অপরদিকে অন্য এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলছেন, ২০১৯ সালেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা পেয়েছেন তারা। এরপর থেকে সে অনুযায়ী নোটের বান্ডিলে পিন মারার চর্চা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বান্ডিলে এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মতো কাগজের ব্যান্ড লাগিয়ে দেয়া হয়।

নোটে পিন মারলে যে সমস্যা হয় :

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বাজারে প্রচলিত বাংলাদেশি ব্যাংক/কারেন্সি নোটসমূহের ওপর সংখ্যা লিখন, সিল, স্বাক্ষর প্রদান বারবার স্ট্যাপলিং করার কারণে নোটসমূহ অপেক্ষাকৃত কম সময়ে অপ্রচলনযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, টাকার ওপর বিভিন্ন কালিতে লিখনের মাত্রা বাড়ছে এবং লেখালেখিতে ব্যাংকারগণের ভূমিকাই মুখ্য। ছাড়া সকল মূল্যমানের পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোটসমূহ ময়লা অচল হয়ে যাচ্ছে এবং স্ট্যাপলিংয়ের কারণে নোটের স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে। ছাড়া লেখালেখি স্ট্যাপলিংয়ের কারণে টাকা দ্রুত ময়লা হয় আর দেখতেও খারাপ লাগে


গ্রাহকেরা বলছেন, নতুন টাকাগুলো কিছুদিন পর যখন হাতে আসে তখন এত ময়লা হয়ে পড়ে যে দেখতেই খারাপ লাগে।

প্রতিবছর নোট ছাপাতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। আর প্রতিনিয়ত খরচ বেড়েই চলেছে। কারণ, টাকা তৈরির কাঁচামাল বিদেশ থেকে আনতে হয় এবং বিদেশে ধরনের পণ্যের দাম প্রতিনিয়তই বাড়ছে।

কি ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় :

পিন মারার কারণে টাকার নোটের দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়া বা অপ্রচলনযোগ্য হয়ে পড়ায় উদ্বেগ তৈরির প্রেক্ষাপটে এটি বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নির্বাহী প্রধানদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছিল, ‘তফসিলি ব্যাংক কর্তৃক ১০০০ টাকা মূল্যমানের নোট ব্যতীত যেকোনো মূল্যমানের নতুন পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোটের প্যাকেট স্ট্যাপলিং করা যাবে না।

কিন্তু এক হাজার টাকার নোটের ক্ষেত্রে ২০১৬ সালের আরেকটি নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। সেই নির্দেশনায় পিন মারার সুযোগ রেখে ৫০০ এক হাজার টাকার নোটের কোথায় কতদূরে পিন লাগানো যাবেসে সম্পর্কিত নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।

ওই নির্দেশনায় বলা হয়, ‘নোটের স্থায়িত্ব স্বকীয়তা বজায় রাখতে এবং গ্রাহকদের সুবিধার্থে ৫০০ ১০০০ টাকার নোটের বাম দিকের মাঝখান থেকে -. সেন্টিমিটারের মধ্যে এটি মাত্র স্ট্যাপলিং পিন ব্যবহার করার নির্দেশনা প্রদান করা হলো।

এখানে নোটের স্থায়িত্ব, স্বকীয়তা গ্রাহকদের সুবিধার কথা বলা হলেও মাঠ পর্যায়ে ব্যাংক কর্মকর্তারা এক্ষেত্রে কাউন্টারে ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন।

২০১৯ সালের নির্দেশনায় অন্য নোটগুলোর ক্ষেত্রে আরও বলা হয়েছে, ‘মূল্যমান নির্বিশেষে (১০০০ টাকার মূল্যমানের নোট ব্যতীত) সকল নতুন পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোট প্যাকেট ২৫ মি.মি. হতে ৩০ মি.মি. প্রশস্ত পলিমার টেপ অথবা পলিমারযুক্ত পুরু কাগজের টেপ দ্বারা ব্যান্ডিং করতে হবে। তফসিলি ব্যাংকগুলো তাদের নোটের নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্বের অন্যান্য দেশে ব্যাংক নোট ব্যান্ডিংয়ে ব্যবহৃত উন্নত প্রযুক্তির অনুসরণ করতে পারে।

টাকার ওপর লেখা :

বাংলাদেশের বাজারে এমন অনেক নোট আছে যেগুলোর বিভিন্ন ধরনের লেখা বা স্বাক্ষর দেখা যায়। বিশেষ করে টাকার পরিমাণ লেখা দেখা যায়। মূলত ব্যাংকে টাকা সর্টিং প্যাকিং করার সময় নোটের ওপর সংখ্যা লেখেন কর্মকর্তারা। আবার কেউ কেউ অনুস্বাক্ষর করেন বা সিল দেন। যেমন এক লাখ টাকার একটা বান্ডিলের সবচেয়ে ওপরের নোটে লেখা থাকতে পারে ১০০,০০০/- এমন বহু নোট বাজারে চোখে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৫ সালেই এক নির্দেশনায় এটি বন্ধ করতে বলেছিল।


এর পরিবর্তে নতুন পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোট প্যাকেটকরণের সময় ব্যাংকের মুদ্রিত ফ্লাইলিফে ব্যাংক শাখার নাম, সিল, নোট গণনাকারী প্রতিনিধিদের স্বাক্ষর তারিখ দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনও অনেক নোটে হাতে লেখা এসব তথ্যাদি চোখে পড়ে।

সবুজ/এএমকে