• ঢাকা বৃহস্পতিবার
    ০৩ এপ্রিল, ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১

আমরা ওরা

প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২২, ০৫:০৭ পিএম

আমরা ওরা

মালবিকা পাণ্ডা

সকাল থেকেই সীমা আর তার স্বামী ব্যাগপত্র সব গোছগাছ করতে শুরু করেছে। অনেক দিন পর তারা বেড়াতে যাবে। কতদিন বাড়ির বাইরে যায়নি। 
জীবনটা কেমন যেন একঘেয়েমি লাগছিল। সেই কবে থেকে লকডাউনের জন্য তারা ঘরেবন্দী। দূরে কোথাও যেতে ভয় পায়, যাওয়ার পর আবার যদি সরকার রাতারাতি লকডাউন ঘোষণা করে দেয়, তাহলে বাড়ি ফেরা হবে কিনা সন্দেহ। কাছাকাছি যদি একটু কোথাও ঘুরে আসা যায় মন্দ হতো না। একটু চেঞ্জ দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ। তিন-চার দিনের ছুটি নিয়ে কাছাকাছি কোথাও একটা গেলেই হলো! 

ঠিক করল পুরী  যাবে। বহুবার গেছে, তবুও পুরীর আকর্ষণ আলাদা। আর রঘুরাজপুর যাবে। যেখানে 
আট থেকে আশি সবাই তুলি হাতে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। 
১৩৩টির মতো বাড়ি, পুরো গ্রামটাই যেন ছবির মতো। দেওয়ালে ভর্তি পটচিত্র। দেখার মতো জায়গা। 
সেখান থেকে পিপলি যাবে। 
বেরোবো বললেই তো বেরোনো যায় না। বাড়িটা এই কদিনের জন্য কার জিম্মায় রেখে যাবে। শুধু তাই নয় ছাদের উপর এতগুলো গাছ আছে, অনেক গাছে আবার কুড়ি এসেছে। জলের অভাবে যদি মরে যায়! বিরাট সমস্যা বাড়ি থেকে বেরোনো। 
তার কাজের মেয়ে যমুনা খুব বিশ্বস্ত। একদম বাড়ির মেয়ের মতো। কোনো হাতটান নেই। তাকে বলতেই এক কথায় রাজি হয়ে গেল। মেয়েটির সদ্য বিয়ে হয়েছে। সীমা বাড়ির চাবি যমুনার কাছে রেখে বেড়াতে আগেও গেছে। এবারেও তাই করলো। 
সীমা আর তার স্বামী যমুনাকে সব বুঝিয়ে দিয়ে তারা চলে গেল। যমুনা আর যমুনার স্বামী রাতে এখানেই থাকবে। 
যমুনা তাদের কথা মতো বাড়ির বাইরে কোথাও যায়নি। চারদিকে যা চুরি। আবার পূজোর মৌসুমে তো কথাই নেই! সুযোগ পেলেই হলো। 
 
সদ্য বিবাহিতা যমুনা। তারও ইচ্ছে করে কোথাও একটু বেড়িয়ে আসি। কিন্তু ইচ্ছা থেকেও তার দায়িত্ব জ্ঞান অনেক বেশি বলে রাতে কোথাও থাকে না। সীমাদের বাড়িতে ঠিক পৌঁছে যায় রাতের বেলায়। 
একদিন কাজের শেষে তার স্বামীকে বলে," চলো না গো আমরাও কোথাও একটা ঘুরে আসি। আমাদের বেশি দূরে যাবার তো ক্ষমতা নেই, সময়ও নেই। কাছাকাছি যদি কোথাও যাই। নিয়ে যাবে!" 

যমুনার স্বামী যমুনার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। যমুনার অস্বস্তি লাগছে। যমুনা চোখ নামিয়ে নিয়ে বলে, "সিনেমার নায়কের মতো তাকিয়ে আছো কেন? আমার বুঝি লজ্জা করে না। চোখ নামাও বলছি। 

বেড়াতে যাবে বলছিলে, চল তবে। কালকে খুব ভোরে ভোরে বেরিয়ে পড়বো। আমি একটা টোটো বুক করে নিই।  
 ---- যমুনার স্বামী টোটো বুক করার কথা বলতেই যমুনার চোখ-মুখ আনন্দে ভরে উঠল। তার জীবনের সব আনন্দ সব খুশি এক মুহূর্তে তার কাছে ধরা দিলো।

তারই প্রতিচ্ছবি তার চোখ-মুখে ফুটে উঠল। বরের সঙ্গে বেড়াতে যাবে যমুনা, আনন্দ আর লজ্জা যেন একসঙ্গে মাখামাখি হয়ে গেছে। কখনও আনন্দে চোখ ঢাকছে আবার কখনও নীচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরছে। এত খুশি সে কখনও হয়নি বোঝাই যাচ্ছে। সীমার ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। না শাড়িটা ঠিক মানানসই হচ্ছে না। 

যমুনা ভাবলো যদি বৌদির একটা শাড়ি পরি, বৌদি কি খুব বিরক্ত হবে! না! বিরক্ত হবে না। বৌদি খুব ভালো। সীমার আলনা থেকে একটা সিফন শাড়ি নিয়ে সেটা পরে স্বামীর সঙ্গে বেরিয়ে পড়লো যমুনা। 
দুজনে কোথায় যাচ্ছে কেউ জানে না। টোটো থেকে মুখ বার করে মাঝে মাঝে বাইরেটা দেখতে কেমন লাগে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। যেতে যেতে ঠিক করবে তাদের গন্তব্য। শহরের দোকান থেকে এটা সেটা কিনে খাচ্ছে। শহরের বাইরে দেখার কত কি আছে যমুনা আগে কখনও দেখেনি। সারাদিন মনের আনন্দে বরের সঙ্গে ঘুরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এলো। 
যমুনা তার স্বামীকে বলে," আমাকে কেউ কখনও এভাবে কোথাও নিয়ে যায়নি, এই প্রথম আমি আমাদের বস্তির বাইরে পা রাখলাম। 

কয়েক দিন পর সীমা আর তার স্বামী ফিরে এলো। 
সীমাকে যমুনা একমুখ হাসি নিয়ে বলে," জানো বৌদি, তোমরা বেড়াতে চলে গেলে, আমি আর আমার স্বামীও বেড়াতে গেছিলাম"। 

সীমা খুশি হয়ে জিজ্ঞেস করে,"কোথায় গেছলি, কি কি দেখলি?" ওই তো আমার বর একটা টোটো ভাড়া করল, আমরা দুজনে মিলে সারা শহর ঘুরলাম, দোকানে ভাত খেলাম। আমার লজ্জা করছিল বৌদি দোকানে খেতে। তারপর ফুচকা খেলাম। সিনেমা দেখলাম, একটা মন্দিরে পূজো দিলাম, তোমাদের নামেও পূজো দিয়েছি বৌদি। কত দূরে গেছো তোমরা," মাকে বললাম, "আমার দাদা-বৌদি যেন সুস্থভাবে বাড়ি ফেরে।" কথাগুলো মন দিয়ে সীমা শুনছিল। যখন শুনলো যমুনা তাদের নামে পূজো দিয়েছে তখন চোখ দুটো ভিজে গেল সীমার। কান্নাটাকে চেপে রাখলো বাইরে আসতে দিলো না।
মনে মনে বলল, আমরাও তো পূজো দিলাম, যমুনার নামে তো দিইনি! একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো সীমা।  যমুনা আবার শুরু করলো জানো বৌদি শহরের বাইরে একটা পার্ক আছে, সেখানে গেছলাম। বাবারে বাবা! কত ছেলে-মেয়ে ওখানে বসে আছে। কত ফুল, কত লোকজন আমার কি ভালো লাগছিল বৌদি তোমাকে কি বলবো! আমরা ছবি তুলেছি বৌদি! তোমাকে দেখাবো। সীমা মন দিয়ে তার কথাগুলো শুনতে শুনতে আলনার দিকে চোখ গেল। সেখানে সিফন শাড়িটা নেই। আলনাটা ভালো করে খুঁজলো, কোথাও পেলো না। যমুনা জিজ্ঞেস করলো, "বৌদি কি খুঁজছো?" 

আমার একটা সিফন শাড়ি ছিল দেখতে পাচ্ছি না। 
বৌদি তোমাকে না বলে ওই শাড়িটা আমি নিয়েছি। 
আমার সেই রকম ভালো শাড়ি ছিল না। তাই ভাবলাম বৌদির এই শাড়িটা পরে যাই। সীমা যমুনার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল,"তুই ওই শাড়িটা পরেছিলি?" 
"হ্যাঁ গো বৌদি"। আমার ভুল হয়ে গেছে। 
ভুল তো হয়েইছে। কথাগুলো এমনভাবে সীমা বলছে ভয় পাওয়ারই কথা। তারপর সীমা একগাল হাসি মুখে বলে, "তোর কাছে আমার আলমারির চাবি ছিল, সেখান থেকে একটা ভালো শাড়ি পরে যেতে পারতিস। এটা পরে কেউ বরের সঙ্গে বেড়াতে যায়?" যমুনা সীমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কোনো কথা বলতে পারছে না। শুধু চোখ দিয়ে জল ঝরছে যমুনার। সীমা যমুনার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, "যা, আগে কাজগুলো কর, তারপর আবার তোর বেড়ানোর গল্প শুনবো। যমুনা চলে গেল রান্না ঘরে। সীমা মনে মনে ভাবতে লাগলো,"

এরা কত অল্পে খুশি। এই শহরে টোটো করে বেড়ানোর এত আনন্দ ওর কাছে! আর আমরা প্লেনে করে বেড়িয়েও মনে খুশি বা আনন্দ কোনোটাই থাকে না। প্লেনে কেন জানলার পাশটা পেলাম না, প্লেন কেন লেট করলো, হোটেলটা ঠিক মনঃপুত হলো না, খাবার বড্ড খারাপ! আরও কত কি। আসলে আমরা যেটা পাইনি, সেটা নিয়েই আলোচনা করি আর দুঃখ করি। আর যমুনারা যেটা পায় সেটা নিয়েই বেশি আলোচনা করে আর খুশি থাকে। ওদের মন আমাদের থেকে অনেক 
বড়। ওইখানে পৌঁছাতে আমরা কখনও পারবো না। শিক্ষার ডিগ্রি নেই, কিন্তু দায়িত্ব-জ্ঞান প্রবল। ওরা কিছু চায় না, শুধু একটু ভালোবাসা, আর দুটো মিষ্টি কথা। মানসিকতার দিক দিয়ে কত তফাৎ। আমাদের নামে পূজোও দিয়েছে। 
আমরা কিন্তু নিজেদের নামে দিলাম, ওদের নামে তো দিতে পারলাম না! আসলে মানসিকতায় কুলোয়নি। যমুনা উচ্চ মানসিকতাসম্পন্ন। আর আমি ......। 

কয়েকদিন পর : সীমা যমুনাকে ডাকে,
"যমুনা এই দিকে আয় একবার কথা আছে।" ডাকতেই যমুনা কাছে আসে। সীমা যমুনাকে বলে, "পরের সপ্তাহে তোকে কাজে আসতে হবে না।" 
যমুনার ভয়ার্ত মুখ দেখে সীমা বলে, "আরে বাবা! তোর নতুন বিয়ে হয়েছে, তোদের হনিমুনে যেতে হবে তো! তোর দাদাকে বলেছি পুরীর টিকিট কাটতে।" 
আমরা পুরী যাবো বৌদি! যেখানে সমুদ্র আছে! বাবা জগন্নাথ দেবের মন্দির আছে! বলে কপালে দু’বার হাত জোড় করে প্রণাম করে নিলো।
হ্যাঁ রে! যত খুশি বেড়াবি সেখানে। ভালো এসি রুম বুক করে দেবো। মন খুলে কেনাকাটা করবি। সব টাকা তোর দাদা আর আমি দেবো। আর যাবার সময় আমার আলমারির যে শাড়ি তোর পছন্দ হবে তুই নিয়ে যাবি। যমুনার চোখ দু’টো চকচক করে উঠলো। তারপর বস্তির সবাইকে ডেকে ডেকে বলে, "আমরা পুরী যাচ্ছি, টেরেনে করে, ফাসটো কেলাসে যাবো।" বৌদি আর দাদা সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে। 
নির্দিষ্ট দিনে যমুনা আর তার স্বামী পুরী গেল ট্রেনে করে ..... ফাসটো কেলাসে। 
    
এসএ/
আর্কাইভ