• ঢাকা শুক্রবার
    ০৪ এপ্রিল, ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

গেম

প্রকাশিত: আগস্ট ২৪, ২০২২, ০৯:১৬ পিএম

গেম

নবনীতা সই

লম্বা করিডোরটা দিয়ে যেতে যেতে, তানিয়ার ঘরের দরজাটা সামান্য ফাঁকা দেখে আমিই উঁকি মেরেছিলাম। হট করে বুকটা কেঁপে ওঠে। ফ্লোরে একটা লাল ধারা। ধড়াম করে দরজাটা ধাক্কা মেরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ি আমি......

সামনে বসা থাকা, পুলিশ অফিসার সৌমিত্র গাঙ্গুলীকে জবানবন্দী দিতে দিতে, জেবিস কোম্পানির সিইওর স্ত্রী মৈনালী চ্যাটার্জী কান্নায় ভেঙে পড়েন।

মৈনালী আর বোধিসত্ত্ব যাকে সবাই বিডি বলেই চেনে, সেই দু’জনের একমাত্র মেয়ে তানিয়া। ভালোনাম তুঙ্গভদ্রা চ্যাটার্জী। সকাল থেকে নিখোঁজ। হয়ত কাল রাত থেকে। 

সুতীক্ষ্ণ নজরে মিস্টার গাঙ্গুলী, মৈনালীর মুখটা আর মাখনের মতন বাহু দুটো এক ঝলকে দেখে নিয়ে, প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন;
কোনো বয়ঃফ্রেন্ড?
আই রিয়েলি ডোন্ট নো।
কোনো শত্রু বা কোনো রকম সাইকো লাভার?
প্লিজ অফিসার, আমি জাস্ট ভাবতে পারছি না। 
আপনি বোঝার চেষ্টা করুন, আমরা যে তদন্ত করবো, আমাদের তো জানতে হবে। মিসেস হালদার, ম্যামকে প্লিজ জল দিন। 

লেডি কনস্টেবল মিসেস হালদার, জলের গ্লাসটা নিয়ে মৈনালীর হাতে দিয়ে বলে ওঠে, আপনার গলায় কিসের দাগ?

মিস্টার গাঙ্গুলী দ্যাখেন, সত্যিই বেশ বড় একটা আঁচড়ের দাগ মৈনালীর ঘাড়ের পাশ থেকে পিঠের দিকে নেমে গেছে। 

মৈনালী জলটা খেয়ে, গ্লাসটা কনস্টেবলের হাতে দিয়ে বলে, পারসোনাল ব্যাপার।

মিস্টার গাঙ্গুলী, হালকা হেসে বলেন, আপনার মেয়ে নিখোঁজ সেটা বিডি জানেন?
হ্যাঁ, আমি সঙ্গে সঙ্গে ফোন করেছি বিডিকে। 
ওকে, তিনি এখন কোথায়?
লণ্ডনে আছে। আজ রাতেই ফ্লাইট ধরবে। 

দেখুন মিসেস চ্যাটার্জী, চব্বিশ ঘণ্টার আগে মিসিং ডাইরি নেওয়া হয় না, তবুও এটা স্পেশাল কেস বলে অলরেডি সার্চ টিম অ্যাকটিভ হয়ে গেছে। ঘরটা আমরা সিল করে দেবো ফরেনসিক ডিপারমেন্টের কাজ হয়ে গেলেই। আপনি সাবধানে থাকবেন। 

আমার মেয়ে, তানিয়া?

সব ঠিক হয়ে যাবে। তানিয়ার ছবি আমরা ফেসবুক থেকে পেয়ে গেছি, কিন্তু ওর ফোনটা পেলাম না। 

আমিও পাইনি। 

শুধু বুঝতে পারছি না, আপনাদের এই ড্রিমল্যান্ড আবাসনের সিকিউরিটি পেরিয়ে কেউ আসবে কি করে?

পিছন দিকটা বেশ জঙ্গলের মতন, ওদিকটা কাজ চলছিল একটা মলের, হঠাৎ একটা পলিটিক্যাল মার্ডার কেসে কাজ বন্ধ আছে এক বছর। 

তবুও খুব আশ্চর্য ঘটনা। তবে আপনি নিরাশ হবেন না। আমরা দেখছি।

প্লিজ অফিসার।

চিন্তা করবেন না ম্যাম। 

তোমরা সব এখানে থাকো। আমি সিকিউরিটি গার্ডের সঙ্গে কথা বলে আসছি। আর হ্যাঁ সি সি টিভি রুমটা দেখে আসবো।

হাত- পা যেন পেটের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। অজানা আতঙ্কে মৈনালীর বুকটা কাঁপছে। এতোদিন নিউজে কতোকিছু দেখেছে, কিন্ত নিজের মেয়ের সঙ্গে ...., না না তানির কিছু হবে না। কাল বাধ্য হয়েই রাতটা বাইরে কাটাতে হয়েছিল মৈনালীকে। কদিন ধরেই বাজোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কটা খারাপের দিকে যাচ্ছে। মৈনালীরা যে লন্ডন ট্যুরে গিয়ে জিগালো ডেকেছে সেটা বাজোরিয়াকে ওদের গ্রুপের কেউ বলে দিয়েছে। 

বাজোরিয়া কাল হোটেল- ইনে ডেকেছিলো মৈনালীকে। আঁচড়ে-খামচে যেন শোধ নিয়েছে মৈনালীর উপর। মৈনালী কিছুই বলেনি, মৈনালী জানে যে, সয় সে রয়। বাজোরিয়াকে তার দরকার। তার ফ্যাশন হাউজটাকে বাড়াতে যে ফান্ড দরকার তা একমাত্র তার বর্তমান প্রেমিক বাজোরিয়া দিতে পারে। একটা এয়ারহোস্টেস ব্লাউজের সঙ্গে সাদা শাড়িটা পড়ে নেয় মৈনালী। 

বিডির আসার কথা দশদিন পর ছিল আজ এসে পড়লে দাগগুলো কি দিয়ে ঢাকবে ভাবার আগেই দরজায় ন্যান্সি নক করে।

ম্যাম পুলিশ আপনাকে ডাকছে। 
তাড়াতাড়ি বের হয়ে যায় মৈনালী।

ম্যাম আপনাদের আবাসনের পিছন দিকটার সব সিসি টিভি ক্যামেরা ভাঙা।

হ্যাঁ ঐ মলটা নিয়ে গন্ডোগোলের সময় সব ভেঙে দিয়েছিল।

আমরা কিছুই পেলাম না। তবে কাল রাতে জ্যাক নামে একজন আপনার মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। দু’জনের কোনো ফ্রন্ট ক্যামেরায় বেরিয়ে যাবার ফুটেজ নেই। 

জ্যাক? হু ইজ হি? আমি কোনো জ্যাককে চিনি না।

আপনি আপনার মেয়ের সব বন্ধুদের ঠিকানা আর ফোন নাম্বার দিন।

সে সব ন্যান্সি দিয়ে দেবে। আমি আপনাদের কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।

আমরা তো চেষ্টা করছি।

অফিসার আমাদের একটাই মেয়ে। আমি কোনো চান্স নিতে চাই না।

সুজয় তুমি বিল্ডিংয়ের সার্চ ওয়ারেন্টটার ব্যবস্থা করো। উপরে গিয়ে ছাদটা সার্চ করো। 
ওকে স্যার।

স্যার স্যার বোস বাবু ডাকছেন। ঘরের দিকে দৌড়ে যান অফিসার সৌমিত্র।

মিস্টার সৌমিত্র, ঘরে ক্যামেরা লাগানো আর খুব সম্ভব কেউ সব দেখছে। 

কি বলছেন বোস?

হ্যাঁ সেটাই। আর মিসেস মৈনালীকে বলুন চিন্তা না করতে এটা ব্লাড নয়। ঘাবড়াবার কিছু নেই। 

ব্লাড নয় মানে?

আপনি কি দেখেছেন রক্তটা?

না না স্যার ক্রাইম সিনের কিছুতে হাত আমরা দিতে পারি না, আপনারা না আসা অবধি।

এটা নকল, ঐ সিনেমায় যেসব কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়।

রঙ?

আপনি এই ক্যামেরার ব্যাপারটা দেখুন। এই ঘরে কোনো ক্রাইম হয়েছে মনে হয় না। হ্যাঁ মিসিং কেস আপনি বলতেই পারেন বা কিডন্যাপিং। কোনো কল কি এসেছে?

না আসেনি।

যাই হোক আমি আসছি। আপনারা সার্চ করুন। ঘরটা লক করে দিন। সঙ্গে মেয়েটার ফোনটা ট্রাক করুন।

করে দিয়েছি স্যার। সুইচ অফ আছে। 
আমি আসছি, আমার এখানে কিছু করার নেই আর।

থ্যাংক ইউ স্যার।

হালদার আপনি মিসেস মৈনালীকে থামান, বলুন কমিশনারের কাছে যাবার দরকার নেই। 

উনি বেরিয়ে গেছেন।

শিট।

আমি যাইনি।

ভালো করেছেন। আপনার মেয়ে..

জানি কিছু হয়নি। জাস্ট প্রাঙ্ক করেছে।

মানে?

মানে জাস্ট আ ফান। আমাকে ফোন করেছিল বাড়িতে আসছে।

এটা কি কোনো জোকস? আজকালকার এই এক ফ্যাশন, ক্যামেরা হাতে লয়ে ফান ভিডিও তৈরি করো। যত্তসব।

আপনি আসুন, আমি কমিশনারের সঙ্গে কথা বলে নেব।

মুখটা রাগে গনগনে হয়ে যায় সৌমিত্র গাঙ্গুলীর। বেরিয়ে যান দলবল নিয়ে।

তানিয়া দুপুরের পর বাড়ি আসে। ততক্ষণে পুলিশ চলে গেছে। ঘরটা ন্যান্সি ক্লিন করে দিয়েছে।

মৈনালীর বুক থেকে পাথর নামে। যতই পুলিশের সামনে নিজেকে কন্ট্রোল করছিল, কিন্তু ভিতরে ভিতরে শেষ হয়ে যাচ্ছিল মৈনালী। তানির ফোনে বুকে বল এসেছিলো।

তানিয়া ঘরে এসেই খেয়ে ঘুমিয়ে পরে।

ঘুম থেকে উঠে বেরোনোর আগে, মৈনালী চ্যাটার্জী বলে, এটা কি তানি? তুমি কি জানো আজ কতটা এমবেরাসড হয়েছি আমি?
কতবার কমিশনারের কাছে সরি বলতে হয়েছে? দিজ ইজ ডিসগাসটিং।
কেন করলে এসব? আর এই জ্যাকই বা কে? আমি তাকে পুলিশে দেব।

পারবে না।

হোয়াট?

হুম পারবে না, জ্যাক তোমার বন্ধু বাজোরিয়ার ভাইয়ের ছেলে। আর এটা ফান ছিল মম। কাল আমার জন্মদিন। এটা না করলে ড্যাড আসতো না।

তার জন্য তুমি এটা করবে? ভাবলে না আমার কি মনের অবস্থা হবে?

মম আমি আজ তিন মাস বাড়িতে প্রায় একা। তোমরা ভেবেছো একবারও এই দুর্ঘটনাটা যখন তখন আমার সঙ্গে হতে পারে? ঐ ন্যান্সি আর ড্রাইভার নিয়ে আমার জন্মদিন পালন করে যাচ্ছি আজ তিন বছর। তোমরা সব সময় বিজি। আই অ্যাম ফেডআপ। আমি কিছুই করিনি তেমন, জাস্ট কাল তুমি বেরিয়ে গেলে যখন আমি জ্যাককে ডাকলাম। ক্যামেরাটা ফিট করে, রক্তের রঙটা লাগিয়ে চলে গেলাম। আমি দেখতে চেয়েছিলাম তুমি কি করো। আই মাস্ট সে, তুমি বড্ড প্যানিক করো।

তোমার মাথায় এসব বুদ্ধি আসলো কেন? যদি কিছু হয়ে যেতো? বেবি তানি তুমি আমাদের প্রাণ হানি। সব কিছুই তো তোমার। তোমার জন্যই আমরা এতো কষ্ট করি।

মোটেই না মম। আমার জন্য তোমরা আমাকে ফেলে বাইরে পরে থাকো? আমার কতটা খারাপ লাগে জানো? তুমি বলতে পারবে আমার পিরিয়ড কবে হয়েছিলো? আমি কোন দিন ফার্স্ট কিস করেছি? আমার ফার্স্ট ডেট? 
কিছুই জানো না মম। আর কিছুই হতো না মম। ঐ ফরেনসিক মালটা সব ডুবিয়ে দিলো। যাক ড্যাড তো আসছে। আমার প্ল্যান সাকসেসফুল। 

তুমি অ্যারেস্ট হতে পারতে তানি। এসব প্রাঙ্ক করার কোনো মানে হয় না। বিডি তো বিজনেস ....

মা আমি একটা প্রশ্ন করবো? মাত্র একটা?

বলো।

আমি যদি না থাকি তখন এসব কিছু দিয়ে তুমি কি করবে? তোমরা ভালো থাকবে তো?

মৈনালীকে এক গম্ভীর প্রশ্নের জালে রেখে তানি বেরিয়ে যায়।
আর্কাইভ