• ঢাকা শুক্রবার
    ০৪ এপ্রিল, ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

প্রেম বেঁচে আছে....

প্রকাশিত: জুন ৪, ২০২২, ০৫:১০ পিএম

প্রেম বেঁচে আছে....

নবনীতা সই

নতুন মালটা কদিন ধরেই খুব ঘুরঘুর করছিল৷ শালা এখনও ডিম ফুটে বের হয়নি এসেছে বিয়ে মারাতে, হারামী বলেই চিক করে থুঃ ফেলে লাভলী আবার গালি দেবার আগেই বিজলী বলে উঠলো, অমন কেন বলছো দিদি? হয়ত তোমাকে সত্যিই ভালোবাসে৷


হা হা হা এই রোজি, হাসিনা শোন শোন এটা কি বলছেরে৷ শালী দু’দিন তো হলো এ লাইনে বুঝবি কি? শোন আমাদের দেখলে অনেকেরই অমন অনেক কিছু লড়েচড়ে বুঝলি কিছু? এখানে আমরা সবাই বেশ্যা, এখানে শরীর আসল মন নকল৷ আমাদের বুকে শুধু হাত পড়ে মন পড়ে না৷ 


হাসিনা বলে ওঠে আরে, বিক্রি হয়ে আসেনি তো৷ অনাথ মাল৷ অনাথ আশ্রম থেকে তো লালবাড়ি ভালো তাই চলে এসেছে কামাতে৷ যদি বিক্রি হয়ে আসতো বুঝতো৷ যত্তসব৷ 


অত্ত হাসি ক্যানরে? আজ কি মোচ্ছব লাগছে নাকি?


আরে বড়িমৌসি আও, আও, শুনহো তুমার নেয়ি বুলবুল ক্যায় বলতি হ্যায়.. 


ক্যায়া বোলে?


বোলে, উহ্ যো নেয়া হারামখোর আতা হ্যায় না লাভলীকে পিছে পড়া হ্যায়, ও মহব্বত করতা হ্যায় লাভলীকো, হা হা হা 


ছাড়ন দে, পোলাপান৷ এ্যাই বারোভাতারীরা এহানে কি বায়োস্কোপ মারাও৷ যা ইহান দিয়া৷ সব নাঙের বিটি৷ হাসিনা যাহ্ বিটিয়া তেরা আদমি শাম হোনে সে প্যাহেলে আ যায়েগা, নিন্দ পুরি করলে৷


লাভলী তুই ও যা৷ আয় বিজলী, আয়, বস আমার কাছে, হুন বইন, ইহানে কোনো পেরেম নাই হক্কলে ধান্ধায় আহে৷ সব শালা এক নাম্বার গুখেগো হারামি৷ কুত্তার দল৷ বাড়ির মাগিকে হাজায় গুজায় রাখপে আর বাজারে আসলি ছিঁড়ে খুঁড়ে যাবে৷

যা নিজের কাম কর, ঘুম দে৷


বিজলী উঠে নিজের ঘরে যায়৷ জীবনের দশটা বছর অনাথ আশ্রমে কাটিয়েছে বিজলী৷ বুলবুল ডাকতো মা, শুধু এটুকু মনে আছে৷ সেই কবে থেকে অনাথ আশ্রমে আছে নিজেই জানে না৷ মা কাজ করতো, একদিন আর ফেরেনি৷ তারপর মামা রেখে দিয়ে এসেছিল অনাথ আশ্রমে৷ বাবার নাম তো মা কোনো দিন বলেনি৷ কতটুকু তখন আর বুলবুল৷ 


বয়স বাড়তেই অনাথ আশ্রমে শুরু হয় গায়ে হাত দেওয়া৷ অত্যাচার বাড়তে থাকে৷ যে দিন গেটম্যান দাদু বুকের উপর চেপে বসেছিল, তখন ধাক্কা দিয়ে ফেলে মাথায় মেরেছিল টর্চ। তারপর নিজেই বেরিয়ে পড়ে একদিন রাস্তায়৷ প্রথমে ভিক্ষা তারপর দালালের হাত ধরে লালবাড়ি৷ 


এখানে বিজলী ভালো আছে৷ কাজ শুধু রাতে৷ সারাদিন নিজের মতন খাও, ঘুমাও৷ রোজ বিজলী এখানে মন ভরে স্নান করে, গন্ধ সাবান, শ্যাম্পু৷ পেট ভরে ভাত খেতে পারে, দুটো ভাত চাইলে কেউ মারে না, মাছের টুকরো, মাংসের টুকরোগুলো বোটকা গন্ধ ছাড়াই পায়৷ 


এখানে মালতী আর চাঁপা মাসি রান্না করে সবার জন্য৷ সকাল থেকে কলতলায় কাজ শুরু হয়ে যায়৷ সবার জন্য রান্না করা, সবার বাসন মাজা এসব এদের কাজ৷ শুধু নিজেদের ঘর পরিষ্কার আর জামাকাপড় কাঁচার কাজ নিজেদের করতে হয়৷ অন্যের নোংরা লাগা জামাকাপড় এরা ধোবে না৷ অবশ্য দোতলার দিদিদের জামাকাপড় এরা ধোয়৷ ওরা দামী মেয়েছেলে, মাসী বলেছিল৷


তবুও বিজলী খুশি৷ নিজের ছোট্ট ঘরটা নিজেই সাজায়৷ কতগুলো টুনি আনিয়েছে বসিরকে দিয়ে৷ বসির বড় মাসির ছেলে৷ এ বাড়িতে কত মেয়েছেলে আছে, কিন্তু বসির সবাইকে বহিন বলে, বিজলী জানে বহিন মানে বোন৷ লাভলী বলে বসির নাকি খোঁজা৷ খোঁজা মানে বিজলী জানে না৷ তবু বুঝতে পারে বসির কারোর দিকে তাকায় না, আবদুল্লাহ বলে যে পানের দোকানের ছেলেটা আছে তার সঙ্গেই বসিরের যত খাতির৷


ছেলেটা রোজ আসে লাভলী দিদির কাছে৷ মাঝে মাঝে লাভলীর ঘরে লোক থাকলে বাইরে বসে থাকে৷ আবার কখনও লাভলী লাথ মেরে ঘর থেকে বের করে দিয়ে বলে, আর আসবি না হারামী কুত্তা কোথাকার৷ বুলবুলের খুব ইচ্ছা করে ছেলেটার সঙ্গে গল্প করতে৷ কোথায় বাড়ি, বাবা মা আছে নাকি? কেন এখানে আসে? হাজার প্রশ্ন করতে৷ লাভলীকে জিজ্ঞেস করলে বিজলীকে নিজে ঠাট্টা করবে৷ বিজলীর কাছে এমন কেউ আসে না, হাসিনা বলে, বিজলী নাকি এখনও ছলাকলা শেখেনি৷ 


গতকাল ছেলেটাকে বসির আর আবদুল্লাহ খুব মেরেছে৷ বলেছে আর কোনো দিন আসবে না এখানে৷ লাভলী দিদির কোনো মায়া নেই, ছেলেটা কত মাস ধরে বলে যাচ্ছিল, লাভলীকে এখান থেকে নিয়ে যাবে, বিয়ে করবে৷ কেন গেল না লাভলী দিদি? বিজলী হলে চলে যেত৷ বিয়ে করে সংসার করতো৷ বিজলীর মায়ের খুব সংসার করার সখ ছিল৷ কত কিছু এনে ঘর সাজাতো৷ তারপর তো একদিন আর এলোই না বাড়িতে৷


আস্তে আস্তে সূর্য্য ডোবে, জেগে ওঠে লালাবাড়ি৷ দুজন কাস্টমার সামলে বিজলী ক্লান্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে৷ আজকের কোটা শেষ৷ দুজনের একজন ঘরে ছিল আর একজন নিয়ে গিয়েছিল বাইরে, দারুণ খাইয়েছে, যদিও একটু বেশি কষ্ট দিয়েছে, সে দিক বিজলী জানে কষ্ট না করলে ভাত নেই৷ দু’জন যা পয়সা দিয়েছে মাসির কাছে দিয়ে দিয়েছে, আর বকশিস লুকিয়ে রেখেছে টিনের বাক্সে৷


 মনটা খারাপ বিজলীর৷ ঘুরে ফিরে সেই ছেলেটার মুখটা মনে পড়ছে৷ খেয়ে এসেছে বলে আর ঝামেলা নেই৷ রাত গভীর৷ কিন্তু এখানে রাত এখনও রঙিন৷ গান বাজনা চলছে, আর সেই আড়ালে অনেক ঘরের চিৎকার, ঢাকা পড়ে যাচ্ছে৷ বিজলীর মনে আছে হাসিনা দিদি বলেছিল যে দিন বিছানায় চিৎকার করা শিখবি তখন বুঝবি তুই ভালো খদ্দের পেতে শিখেছিস৷


ভোরের দিকে চোখ লেগে গিয়েছিল ভাবতে ভাবতে, হঠাৎ ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ হতে বিজলী জেগে ওঠে৷ প্রথমে ভেবেছিল মাতালের কারবার, তারপর কান পেতে শুনে মনে হলো কোনো মেয়ে, বাইরে বেরিয়ে এসে দ্যাখে লাভলী দিদি বুকে মদের বোতল নিয়ে রোয়াকে শুয়ে৷ বিজলী গিয়ে গায়ে হাত দিতেই বলে, আরে বিজলী, ঘুমাসনি?


তুমি এখনও মদ খাচ্ছো? 

খাচ্ছি তো বেশ করছি, তোর কি রে মাগি।

আরে ধুলো লাগবে তো গায়ে৷

হা হা হা ধুলো.. গায়ে কত

জানিস তো ছেলেটা সত্যি খুব ভালোবাসতো রে, আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতো৷ কিন্তু বোন কোনো দিন কাউকে বুঝতে দিবি না তুই কাউকে ভালোবাসিস, শালা তাহলেই সব হারামীরা পেয়ে বসবে৷ আর কি হতো বল? ভালো ছেলে, বাপ নেই, কাজ করতে এসেছে কতদূর থেকে, কি হবে বল আমাকে ভালোবেসে? জীবন বরবাদ হবে৷ কেউ মানবে? কেউ মানবে না৷ 


বাড়িতে বুড়ো বাপ আছে, ভাইটা পড়ছে, মায়ের চিকিৎসা, সবাই জানে আমি কোলকাতায় চাকরি করি, কোথায় যাবো রে বিজলী, পায়ে যে শিকল বাঁধা৷ যা বোন যা ঘুমাতে যা৷


চলো ঘরে চলো দিদি৷


শালা বসির কি রস মারলো৷ আমি জানি আমি রাজি হলেই মেরে দিতো শালাকে৷ এখানকার মেয়েকে নিয়ে যাওয়া কি সহজরে?


তুই যা, ঘরে যা ঘুমো।


বিজলী আস্তে আস্তে সরে আসে। লাভলী দিদি ভালোবাসাতো ছেলেটাকে। তাহলে চলে গেল না কেন? এমন কেউ বিজলীকে বললে সে চলে যেত। কক্ষনও বিজলী হয়ে থাকতো না।মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল বিজলীর। কেউ জানালো না, লাভলী দিদির পরিবার জানলো না। ছেলেটা জানলো না, লাভলী দিদির ভালোবাসা বুকে রয়ে গেল। বেশ্যা হলেও বুকে প্রেম বেঁচে থাকে।









আর্কাইভ