• ঢাকা বৃহস্পতিবার
    ০৩ এপ্রিল, ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১

লাভ লেটার

প্রকাশিত: মে ২৮, ২০২২, ০৪:২০ পিএম

লাভ লেটার

মালবিকা পাণ্ডা

সে অনেক বছর আগের কথা। তখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি। পড়ি মানে "পড়ি"। "পড়াশোনা" করি না । আমার কাজই ছিল সুন্দরী মেয়েদের পিছনে লাগা। 
তখন মনে হতো, এই তো জীবন, মেয়েদের পিছনে লাগার আর অবাধ বিচরণ করার মোক্ষম জায়গা। 
পড়াশোনার চাপ নেই, আরে বাবা চাপ নিলে তো চাপ 
থাকবে! লাস্ট বেঞ্চে বসতাম, আর মাঝে মাঝে সুন্দরী মেয়েদের দিকে একটা করে "লাভ লেটার" ছুঁড়ে মারতাম। তারপরেই সুবোধ বালকের মতো মাথা নিচু করে বসে থাকতাম। এমন ভাব দেখাতাম, "আমি কিছু জানি না"।  মার খেত পাশের ছেলেটি।
এ ভাবেই কেটে গেল কটা মাস। টেস্ট পরীক্ষার আগে একটা পরীক্ষা নেওয়া হলো স্কুল থেকে। কে, কেমন পড়াশোনা করেছে। পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোলো। সবাই  ভালোভাবে পাস করলো। আমার পাশে বসা মার খাওয়া ছেলেটিও ভালোভাবে পাস করে গেল। আর আমি! অংকে বিগ জিরো, ইংরেজিতে দুই, ভূগোলে পাঁচ আর বাকিগুলো না বললেও চলবে। আমার মার্কশিট দেখে আমার বাবা আমাকে এতো আদর করেছিলেন, 
যে দু’সপ্তাহ স্কুলের মুখ দেখতে পারিনি। সেটা আমার দুঃখ নয়। দুঃখ ওই, সুন্দরী মেয়েদের হাসি, কতদিন দেখিনি। কি খারাপ লাগছে! কি বলব! 
     আমাদের স্কুলে একজন নতুন টিচার এলেন।
অংকের টিচার। প্রথম দিন আমাদের ক্লাস নিতে এলেন। এসেই এমন একটা ফরমান জারি করলেন, 
যে, তার থেকে মৃত্যু ভালো ছিল। ফরমান কি ছিল জানেন?, "লাস্ট বেঞ্চের সবাই ফার্স্ট বেঞ্চে চলে 
এসো, আর ফার্স্ট বেঞ্চের সবাই লাস্ট বেঞ্চে চলে যাও"। ভাবতে পারছেন কি অবস্থা তখন আমার? 
কি আর করবো! আস্তে আস্তে মাথা নিচু করে ফার্স্ট বেঞ্চে গিয়ে বসলাম, একেই তো পরীক্ষায় ফেল করেছি। এরপরে টেস্ট, তারপরে ফাইনাল। যদি ফেল করি, তাহলে আমার ওই হিটলার বাবা, আমার চামড়া তুলে ডুগডুগি বাজাবে, বাজানোর পর সেই চামড়া আমার গায়ে 
ডেনড্রাইট দিয়ে জুড়ে দেবে। 
স্যার প্রথমেই এসে আলাপ পর্ব শুরু করলেন। নাম কি? কিসে কত নম্বর পেলে? আচ্ছা বলুন তো, নাম জিজ্ঞেস করলেন  ঠিক আছে। কিন্তু নম্বর? নম্বর জেনে 
আপনার কি হবে? কি আর করা যায়, আমার পালা আসতেই নাম বললাম, অতুলপ্রসাদ। স্যার চশমার ফাঁক দিয়ে গোল গোল চোখ করে বললেন "সেন"।
আমি দাঁত বার করে হেসে বললাম, না 
স্যার, "পাহাড়ি"।
স্যার এর পর "স্যানাল" বলবেন না যেন? 
এই বলা, স্যার দুই ভুরু উপর তুলে নাচিয়ে বললেন, "কত"। আমি সুবোধ বালকের মতো বললাম বয়স জানতে চাইছেন স্যার? স্যার টেবিলের উপর সপাটে একটা খেজুর ছড়ি বসিয়ে বললেন, "নম্বর"।
আমি মাথা চুলকে মনে মনে বলছি, এটা এলো কোত্থেকে? আমার অবস্থা কাহিল করে দেবে? 
স্যার আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন, 
কি ভাবছো?" আমি এলাম কোত্থেকে?" 
এই মরেছে! স্যার কি মুখের বলি রেখা পড়তে জানেন? স্যার তখন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "অবস্থা কাহিল করে দেবো কিন্তু"। 

কথাটা শুনেই আমার সারা শরীরে এমনকি মস্তিষ্কেও যেন কারেন্টের শক লেগে গেল । স্যার সত্যি সত্যি মনের কথা বুঝতে পারেন। এবার আমার কি হবে? লাভ 
লেটারের প্রেরক দাতার নাম যদি বুঝতে পেরে 
যায়? 
কি হলো? নম্বর বল? আমি নম্বরগুলো সব গর্বের সঙ্গেই বললাম। ভয় কেন পেতে যাবো? পড়িনি, ফেল করেছি। 
    ফার্স্ট বেঞ্চে বসছি বলে, আমার অভ্যাস কিন্তু বদলায়নি। 
    পরের দিন, স্যার আমাকে বললেন, "ছুটির পর আমার সঙ্গে দেখা করো একবার"। 
     যা! বাব্বা!  এ স্যার আবার কি বলবে আমাকে? 
যাই হোক আমি গেলাম স্যারের বাড়ি। 
       স্যার আমাকে দেখে খুশিই হলেন। এসো অতুল। 
ভিতরে এসো। 
     আমি ভিতরে কি ঢুকবো: ভয়ে হাঁটু দুটো কি কাঁপছে, মনে হচ্ছে মালাইচাকিটা বোধহয় খুলে বেরিয়ে আসবে। ভিতরে ঢুকলাম। চারদিকে চোখ দুটো ঘুরছে। এমন সময় স্যার বললেন, কি দেখছো? আমার ঘরে তেমন কিছু নেই। এই বইপত্র, 
খবরের কাগজ, কিছু জামা কাপড় আর একটা স্টোভ আর কিছু বাসনপত্র। 
      স্যার আপনার মিসেস মানে আমাদের কাকিমাকে আনেননি? তাকে দেখছি না তো? 
     না, তিনি নেই, আমি বিয়ে করিনি। 
  আমাকে ডেকেছেন কেন স্যার? কথাটা বলেই আমি মাথাটা নিচু করলাম। আমি তো জানি স্যার কেন আমাকে ডেকেছেন। স্যার আমার সম্বন্ধে সব শুনেই তো আমাকে ডেকেছেন। স্যার কি বুঝতে পেরেগেছেন চিঠিগুলো আমারই লেখা! তাহলে কি হবে? এরপর আমার হিটলার বাবাও জেনে যাবে। তখন কি হবে? ভবিষ্যৎ কি হবে আমি কল্পনা করে নিলাম। বেধড়ক মার। 
    অতুল! স্যারের ডাকে আমার কল্পনার জাল ছিঁড়ে গেল। 
       হ্যাঁ স্যার বলুন। কেন আমাকে ডেকেছেন? 
স্যার একটি সিগারেট ধরিয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার বাবা কি করেন?" 
     বাবা একটি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। 
যেই বলেছি, ওমনি স্যারের বাক্যবাণ আমার দিকে তির বেগে আসতে লাগল, "একজন শিক্ষকের ছেলে হয়ে তুমি এই রকম নম্বর পেয়েছো? যারা পড়াশোনা করে না, কিন্তু ক্লাসটা মন দিয়ে করে, তারাও পাস করে যায়, আর তুমি পাস করতে পারলে না? ছাত্ররা চেষ্টা করলেও এই রকম নম্বর পায় না। তোমার অসুবিধাটা ঠিক কোথায় বলতো? কেন তুমি এই রকম করছো? 
    স্যারের কথাগুলো মাথা নিচু করে শুনছিলাম। কোনো উত্তর দিতে পারিনি।

তুমি মেয়েদের প্রেমপত্র দাও কেন? তুমি কি কোনো মেয়েকে ভালোবাসো? নাকি এটা একটা নেশা? 
      না  নেশা নয়। কিছুটা মজা করার জন্য, আর কিছুটা ভালো লাগার জন্য। 
     স্যার বিরক্ত হয়ে বললেন, "সব মেয়েকেই 
তোমার ভালো লাগে"? সব মেয়েকেই প্রেমপত্র দাও? 
        তাড়াতাড়ি করে বললাম, "না স্যার,
শুধু স্মৃতি"। নামটা বলেই লজ্জায় পড়ে গেলাম।   
       স্যার সিগারেটটা হাত থেকে ফেলে দিয়ে রাগান্বিত হয়ে বললেন, "তোমার এই মজা আর ভালো লাগা তোমার জীবনের একটা মূল্যবান সময় নষ্ট করে দিচ্ছে সেটা বুঝতে পারছো? "একবারও ভেবে দেখেছো মেয়েটি তোমাকে পাত্তা দিচ্ছে কিনা? 
সে তোমাকে পছন্দ করে কিনা? তুমি তার যোগ্য কিনা?"
     স্যারের কথাগুলো আমার হৃদয়ে গিয়ে ধাক্কা মারলো। ঠিকই তো। মেয়েটি আমাকে পছন্দ করে কিনা সেটা তো জানি না। ভুলটা তো আমারই। 
স্যার আমার কাছে এসে বসে কাঁধে হাত রেখে বললেন,
"আগে মানুষ হও, তারপর প্রেম করো, না হলে 
প্রেম টিকবে না। "একবার যদি একটা নিজের জায়গা তৈরি করে নিতে পারো, তাহলে দেখবে প্রেম 
তোমার পিছনে পিছনে দৌড়াচ্ছে। তোমাকে প্রেমের পিছনে দৌড়াতে হবে না। আর তুমি এখন যেটাকে প্রেম বলছো, সেটা প্রেম বা ভালোবাসা নয়, সেটা 
একটা চোখের মোহ। এই বয়সে সব মানুষের মধ্যে হয়। এটাকে কাটিয়ে উঠতে পারাটাই জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া দরকার । 
       স্যার হঠাৎ তার পকেট থেকে একটা ধূসর ছেঁড়া কাগজ বার করলেন। তারপর সেটা আমাকে দেখিয়ে বললেন, "এটা কি জানো"? দেখাতে দেখাতে স্যারের চোখ দুটো দেখলাম চকচক করে উঠলো। 
       আমি কথা বলতে পারলাম না। শুধু ঘাড় নেড়ে 
"না" বললাম। 
      স্যার সেটাকে হাত দিয়ে যত্ন করে খুলে দেখলেন, তারপর আবার সযতনে ভাঁজ করে রেখে দিলেন। কি লেখা আছে পড়তে পারিনি । অবশ্য পড়ার ইচ্ছেও হলো না। শুধু বুঝতে পারলাম একটা চিঠি। স্যার বললেন এটা আমার" প্রেমপত্র, যেটা তোমরা, এখনকার ছেলেমেয়েরা বলো"  লাভ লেটার"। কথাটা শুনেই আমি হকচকিয়ে উঠলাম।
কি শুনছি স্যারের মুখে? স্যারের লাভ লেটার, আমাকে এই বয়সে দেখাচ্ছেন? কেন? 
      জানো অতুল? আমিও তোমার মতো ছিলাম। পড়াশোনায় নয়, বয়সে। আমারও একজনকে ভালো লাগতো। আমি গরীব বাবা-মায়ের সন্তান ছিলাম। কলেজে পড়ার সময় তাকে প্রপোজ করলাম। আমাকে বলেছিল" কিছু করে দেখাও" ।
তারপর প্রপোজ করবে। আমি ছাত্র হিসেবে বিশাল 
কিছু ছিলাম না। তবে ফেল করিনি। অংক নিয়ে পড়ার খুব ইচ্ছে ছিল। সেটা নিয়েই এগোলাম। 
বি এস সি তে ভালো রেজাল্ট করলাম, এম এসসি তেও ভালো করলাম। পি এইচ ডি করলাম। স্কুলে চাকরি নিলাম। কলেজে করতে পারতাম, কিন্তু করিনি। তারপর একদিন" তার" বাড়িতে গেলাম।
আমাকে কেউ মেনে নিল না। কারণ কি জানো? 
আমি তাদের কাছে নগন্য। একটা হাই স্কুলের টিচার তাদের বাড়ির জামাই হবে? যাকে ভালোবাসতাম তাকে জিজ্ঞেস করলাম। আমি ভাবতাম সেও আমাকে ভালোবাসে। পরিষ্কার না করে দিলো। প্রফেসর হলে 
আমাকে মেনে নিত। আমি অবশ্য প্রফেসর হতে পারতাম। হইনি। যে স্কুলে তুমি এখন পড়ছো, ওই স্কুলে আমিও পড়তাম। সে অন্য স্কুলে পড়ত। ওই স্কুল থেকেই তাকে মনের মধ্যে জায়গা দিয়েছিলাম। 
   এই পর্যন্ত বলে স্যার চুপ করে গেলেন। তাকিয়ে দেখলাম স্যারের হাত দুটোর উপর টপটপ করে জল পড়ছে। স্যার আস্তে আস্তে মুখটা তুলে বললেন, 
"কি লাভ হলো আমার"? "তার" কথা মতো আমি কিছু করে দেখালাম। 

"জানো অতুল! সে কথা রাখেনি! আমি রেখেছি।
সে তার বাবা-মায়ের পছন্দ করা ছেলেকেই বিয়ে করে চলে গেল। স্যার ধূসর ছেঁড়া কাগজটা বার করে বললেন, এখন প্রেম নেই, আছে শুধু এই পত্রখানি"। 
         তোমার জীবনটা তুমি গুছিয়ে নাও আগে। তারপর প্রেম করবে। না হলে আমার মতো অবস্থা 
হয়ে যাবে। আমি স্যারের মুখের দিকে তাকালাম।
আমারও চোখ দুটো কখন ভিজে গেছে বুঝতে পারিনি।
   "তুমি আমার কাছে পড়বে অতুল?"
আমি স্যারের পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করে বললাম 
"পড়বো স্যার"। আপনি যেভাবে বলবেন সেইভাবে 
পড়বো স্যার। 
      স্যার আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, "তাহলে
আজ থেকেই শুরু করো"। 
    স্যারের কাছে পড়ার পর আমি টেস্টে স্কুলে সবচেয়ে ভালো নম্বর পেলাম। আর ফাইনালে
দুটি বিষয়ে লেটার পেয়েছিলাম। তখনকার ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করাটা ছিল স্বপ্নের মতো। এখন তো 
পরীক্ষায় বসলেই ৯০%। 
    উচ্চ মাধ্যমিকে আরও ভালো করলাম। স্যারের ইচ্ছেটাকে মান্য করেছিলাম। অংকে অনার্স নিয়ে ভর্তি হলাম। তারপর থেকে আর আমাকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আমিও ডক্টরেট করলাম।
তারপর আমি কলেজে চাকরি নিলাম। যে মেয়েটির দিকে লাভ লেটার ছুঁড়ে মারতাম। একদিন তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আমি ভাবতে পারিনি সে এখনও অবিবাহিত। পরে জানলাম সে আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে। তার বাড়িতে আমি আর আমার স্যার একদিন গেলাম। স্মৃতির বাবা-মা খুব খুশি। 
একদিন দুই বাড়ি থেকে আমাদের বিয়ে দিয়ে 
দিলেন। এটা স্যারের জন্যই সম্ভব হয়েছে। স্যার সব স্মৃতিকে আগে থেকেই বলে দিয়েছিলেন। তার জন্য আমি কতটা পরিশ্রম করছি, তার জন্য আমার জীবনটা বদলে গেছে, আমি একটা সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ হয়ে গেছি। 
    সে দিন স্যারের কথা যদি আমি না শুনতাম, তাহলে 
আমি কোথায় হারিয়ে যেতাম। আজ আমার কাছে সব আছে। আমার প্রথম প্রেম স্মৃতি, আমার  মেয়ে, আমার "লাভ লেটার" সব আছে। আজ নেই শুধু আমার স্যার। সব থেকেও মনে হয় কিছুই নেই।
স্যার, ফিরে আসুন আমার কাছে। আমার ছেলে 
হয়ে। একদিন আমি আপনার ছেলে ছিলাম, এবার আপনি আমার ছেলে হয়ে আসুন। বড় ফাঁকা লাগছে স্যার। আমার শূণ্য বুকটা ভরিয়ে দিন স্যার! আমি আপনার স্যার হব আর আপনি হবেন আমার 
পৃথিবী। আপনি অসময়ে চলে গেলেন স্যার। ধরে রাখতে পারলাম না । 
     স্যার! অতুল স্যার! কি হলো? বলতে বলতে ছবির দিকে তাকিয়ে.... কাঁদছেন স্যার!
     না না কিছু না। আমার দেবতার পা ধুইয়ে দিলাম।
আর তাকে স্মরণ করলাম।
তোমরা এবার শুরু করো .....

আর্কাইভ