নবনীতা সই
আজ সকাল বেলায় বেরিয়ে গেছে সৌমিত্র, কল্পনাকে বলেও যায়নি৷ কাল থেকেই মুখটা থমথমে ছিল৷ কল্পনা তো চোখের জল সামলাতে পারে না, সৌমিত্র চুপ করে যায় সেটা কল্পনা জানে৷ কাল রাতের খাবার টেবিলে বসেই কথাটা বলেছিল অর্ক, যখন কল্পনা ওদের ভবিষৎ পরিকল্পনা জানতে চেয়েছিল৷
তোদের প্ল্যানটা কি অর্ক?
কোন প্ল্যান মা?
না মানে বিয়ে হয়েছে প্রায় তিন বছর তো হতেই চললো ... তাই বলছিলাম ...
হুম আমিও মাশাকে বলছিলাম এবার আমাদের বিদেশ যাবার প্ল্যানটা নিয়ে ভাবা উচিত৷
মানে? তোরা বাইরে চলে যাবি বলিসনি তো!
মা ডোন্ট ওভার রিয়্যাক্ট, আমরা চাইলেই কি যেতে পারবো। হাজারটা ঝামেলা আছে৷ এখন একটা সুযোগ এসেছে, দেখা যাক৷
তোরা ফ্যামেলি প্ল্যানিং করবি না?
আহ্ কল্পনা! ওদের জীবনটা ওদের মতন সাজাতে দাও ৷
না মা, কোনো প্ল্যান নেই ৷ কি হবে ছেলে মেয়ে। ভবিষৎতে নিজেকে নিজের দেখতে হবে সেটা মেনে নিয়েই চলতে হবে৷ আমিও তোমাদের কতটুকু সময় দিতে পারি।
তবুও তোরা সন্তান নিবি না? বাবা ডাক শুনবি না?
মাশা মা হতে আপাতত চায় না৷ ওই দেশে গেলে মা হওয়ার কথা ভাবাই যাবে না, বেবী দেখবে কে? হ্যাঁ যদি দেশে ফিরি তো ভাববো৷ তবে খুব একটা হোপ রেখো না৷ আর হ্যাঁ তোমাদের সব কাগজপত্র দিও, ভিসা করাতে হবে৷ তোমাদের নিয়ে যাবো আমি৷ আমার পক্ষে বারবার আসা তো সম্ভব হবে না৷ সবকিছু গুছিয়ে যেতে হবে৷
আমি যাবো না৷ এই বয়সে বিদেশে গিয়ে আমি আর মানিয়ে নিতে পারবো না।
শোনো মা, এত্ত বড় ফ্ল্যাট তোমরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারো৷ কিন্তু কত ঝামেলা হবে বলো তো? ইলেকট্রিক বিল থেকে বাবাকে সব রকম কাজ নিজে করতে হবে ৷ কাজের লোক, রান্নার লোক, গ্যাস, বাজার অনেক টাফ!
সেই সময় সৌমিত্রের থমথমে মুখ দেখেই কল্পনা বুঝেছিল কিছু একটা ভাবছে সৌমিত্র, যা কল্পনাকে ও বলেনি৷
অর্ককে নিয়ে নিজের মনোভাব স্পষ্ট ছিল সৌমিত্র আর কল্পনার৷ ছেলে উচ্চশিক্ষিত হবে, বড় অফিসে কাজ করবে৷ নিজেদের কাছে হয়ত থাকবেই না৷ বিদেশে চলে যাবে৷
নিজেদের একান্নবর্তী পরিবারে সৌমিত্র নিজের জন্য যেটুকু করতে পারেনি, অর্ক সে সব করবে৷ তার বৌয়ের জন্য কিছু কিনতে তাকে লুকাতে হবে না, সব সময় বড়দের শাসনে থাকতে হবে না৷ ঠিক যেমনটা চেয়েছিলেন তেমনটাই তাদের আদরের অর্ক হয়েছে৷ এম বি এ করে সে এখন বড় একটি কোম্পানিতে চাকরিরত৷
সৌমিত্র অবসর নিয়ে নিয়েছেন৷ স্ত্রী কল্পনাকে নিয়ে মাঝে মাঝেই গাঁয়ের বাড়িতে বেড়াতে যান৷ ছেলের সুবিশাল ফ্ল্যাটে দম বন্ধ লাগে৷ অর্কের স্ত্রী মাশা অর্কের সঙ্গেই চাকরি করে৷ যত্নের ত্রুটি নেই, অভাব আন্তরিকতার৷ টাকার অভাব নেই, তবুও কোথাও যেন সুর কেটে গেছে এমন ভাবনা৷
একটা সময় থাকে তখন যেন মনে হয় কাউকে দরকার নেই, আর সত্যিই দরকার পড়ে না তখন৷ সন্তানের পড়াশোনা, চাকরির চাপ, স্বামী-স্ত্রী একটু সময় কাটানো, তার ওপর বন্ধু বান্ধব, অফিস পার্টি, বছর শেষে বাইরে ঘুরতে যাওয়া ৷ সময় কেটে যায় হু হু করে৷ তখন বারণ নিষেধগুলো অহেতুক মনে হয়৷
তারপর বয়সের সঙ্গে খাওয়া দাওয়া থেকে টিভির অনুষ্ঠানগুলো দেখার মানসিকতা পাল্টে যেতে থাকে৷ ব্যস্ততা থেকে অবসর আর অবসর থেকে উদাসীনতা জন্ম নেয়৷ নিজেদেরকে সুস্থ রাখা, হাঁটাহাঁটি থেকে ডায়েট সবকিছু মিলিয়ে জীবনটা কেমন ওষুধ ওষুধ গন্ধের মতন তেতো হয়ে যায়৷
পুরনো দিনগুলো তখন মনে পড়ে৷ সেই জেঠুর হাতে মার খাওয়া, কাকার সঙ্গে বাইস্কোপ দেখতে গিয়ে মায়ের কানমলার হাত থেকে ঠাকুমার রক্ষা করা৷ বাবার গম্ভীর চাউনি, খাবার সময় আবার মাছটা পাতে তুলে দেওয়া৷ সবকিছু মিলিয়ে পুরনোকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা ৷ তাই বলে কি গাঁয়ের বাড়িতে গিয়ে আর থাকা সম্ভব? একদম না৷ শহরের জীবনযাত্রায় অভ্যস্থ হয়ে গাঁয়ে গিয়ে থাকা সম্ভব হয় না৷ মাঝে মাঝে গিয়ে ঘুরে আসাই যথেষ্ট, কল্পনার তো একদম ভালো লাগে না৷ ওখানে গেলে শাড়ি পড়ে থাকো, কারেন্ট থাকে না, নেট স্লো৷ কমোড নেই, আরও কত অভিযোগ৷ সৌমিত্রের জন্যই যায়৷
আবার ফ্ল্যাট বাড়িতে ফাঁকা লাগে সৌমিত্রের, নাতি নাতিনী নেই, আর কবে হবে সেটাও বলা অনিশ্চিত৷ হ্যাঁ দুটো বড় কুকুর আছে৷ আর তাদের পিছনের খরচের বহর দেখলে সৌমিত্রের আত্মারাম খাঁচা হয়ে যায়৷ তাদের জন্য দামী খাবার আসে, মাশার আবার খুব খুঁতখুঁতে ভাব আছে, ওদের পোশাক আশাক নিয়ে৷ ডাক্তার, ওষুধ, খাওয়া সব মিলিয়ে অনেক খরচ৷ গাড়ি থামতেই সৌমিত্রের ভাবনাটা বাস্তবে হোঁচট খায়৷
বড় বাড়িটার গেট খুলে ভিতরে যেতেই মনটা ভালো হয়ে যায়৷ সামনে খোলা মাঠের আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কটেজগুলো৷ বড় বড় গাছ, বেঞ্চি পাতা আছে৷ কিছুটা গেলেই গঙ্গা, এখান থেকেই হাওয়া বলে দিচ্ছে তার উপস্থিতি৷
আনন্দ আশ্রমের অফিসে গিয়ে নিজের আর কল্পনার জন্য একটি কটেজ বুক করেন সৌমিত্র, কাগজপত্র আর অ্যাডভান্স টাকা পয়সা জমা করে, হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দাঁড়ান গঙ্গার ঘাটের সামনে, ছোট একটা শিব মন্দির রয়েছে ঘাটে৷
কিছু সময়ের পরেই ম্যানেজার তাকে তার কটেজটা দেখায়৷ ম্যানেজার শৈবাল ছেলেটা অনেকটা সৌমিত্রের ছেলের বয়সী হবে৷ বেশ হাসিখুসী আর মিশুক, বকবক করতে করতেই ঘর দেখায়৷
বড় একটা শোবার ঘর, একটা রান্নার জায়গাসহ খাবার জায়গা, আর বারান্দা আছে৷ সব মিলিয়ে বেশ সুন্দর৷ শোবার ঘরের সঙ্গেই বাথরুমের ব্যবস্থা আছে৷ পাশাপাশি চারটে কটেজ৷ এখানে একা থাকার ব্যবস্থাও আছে৷ তাদের থাকার ব্যবস্থাটা আলাদা, বড় একটা দোতলা বাড়িতে৷ বাড়ি আর কটেজগুলোর মাঝখানে পার্কের মতন৷ বসার জায়গা, ফুলগাছ আর পাতাবাহার দিয়ে সাজানো৷ এখানকার আবাসিকরা সুন্দর পার্কের মতন বাগানটার দেখাশোনা করে বোঝা যাচ্ছে৷ কয়েকটি গাছের ফুল নিয়ে বেশ কয়েকজন উৎসাহ নিয়ে কথা বলছিল৷
সৌমিত্র ম্যানেজার ছেলেটাকে বলে আপনি আমাকে জানাবেন আমরা কবে আসবো, রঙ টং গুলো,
আরে জেঠু আমাকে তুমি কিংবা তুই বলবেন কোনো সমস্যা নেই ৷ আপনার কিছু চিন্তা করতে হবে না৷ আমি রঙ করে, সবকিছু গুছিয়ে দিন সাতেকের মধ্যেই ফোন করবো৷ এখানে খুব ভালো লাগবে দেখবেন৷ মা গঙ্গা আছে আর আপনার কোনো সমস্যা হবে না। সব কিছু ফোনে ফোনে হয়ে যাবে, আপনি শুধু ফোন করবেন৷
সৌমিত্র হেসে বেরিয়ে আসলেন৷ জায়গাটা খুব পছন্দ হয়েছে তার৷ আস্তে আস্তে সবার সঙ্গে আলাপ হলে আরও হয়ত ভালো লাগবে৷ তিনি ঠিক করলেন, কল্পনা না আসতে চাইলে তিনি নিজে একাই চলে আসবেন৷ এই বয়সে নতুন দেশ, নতুন শহরে গিয়ে বসবাস করা তার পক্ষে অসম্ভব৷ নাতি নাতিনী থাকতো তাও যেতেন তার জন্য, আজ শুধুশুধু ছেলে বৌয়ের দায়ভার হয়ে কোথাও যাবেন না৷
সৌমিত্র জানেন কল্পনা সহজে রাজি হবে না৷ কিন্তু ওই ফ্ল্যাটবাড়িতে নিঃসঙ্গ হয়ে থাকা তার পক্ষে অসম্ভব ৷ যেমন কল্পনার সৌমিত্রের গাঁয়ের বাড়িতে থাকা অসম্ভব৷ এই বৃদ্ধাবাসের কথা তাকে তার বন্ধু বলেছিলেন৷ সবাই মিলে আনন্দে থাকা৷ এখানে যোগ শেখায়, বছরে ঘুরতে নিয়ে যায়, চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে৷ সর্বপরি কটেজে ছোট্ট একটু রান্নার ব্যবস্থা আছে৷ সব রকমের ব্যবস্থা আছে ৷ ডাক্তার আছেন সর্বক্ষণের জন্য৷ আর কোলকাতার কত কাছে৷
এখানে নিজের দেশ, নিজের ভাষার মাঝে থাকা অনেক ভালো৷ আর সেই সময় সৌমিত্রের মনে হয়েছিলো কল্পনাকে নিয়ে আলাদা থাকার কথা, পরিবারের শাসন বারণ তার ভালো লাগেনি, আজ হয়ত অর্কের ভালো লাগছে না। কে বলতে পারে, যেটা তখন সৌমিত্রের বাবার কাছে স্বাধীনতা আর সৌমিত্রের কাছে বাধা ছিল আজ সেটা অর্কের কাছেও তাই৷
যেটা আজ থেকে তেত্রিশ বছর আগে সৌমিত্রের কাছে একান্নবর্তী পরিবার বাধা ছিল, আজ হয়ত সন্তান, পরিবার অর্কের কাছে বাধা৷ যুগ পাল্টাচ্ছে৷ তাই সবার ভালোর জন্য এটাই ঠিক মনে হয়েছে সৌমিত্রের৷ অর্ক সন্তান নেবে কি না, কিভাবে কাটাবে জীবন সেটা অর্ক ভাবুক৷ সৌমিত্র নিজের জীবন নিজের মতন কাটিয়েছেন৷ আজ অর্ক কি করবে অর্ক ঠিক করুক৷ সৌমিত্র নিজের বাকি জীবন নিজের দেশেই কাটাবে৷
মনটা হালকা হয়ে যায়, বাড়ির দিকে রওনা দেয় সৌমিত্র৷ তাকে যে কল্পনাকে বুঝাতে হবে৷
ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন