নবনীতা সই
সূর্য ওঠার আগেই ফজরের নামাজ দিয়ে শুরু হয় ঊর্মির দিন। আর রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করে শেষ হয়।
বাড়ির সবার জন্য নাশতা পানির ব্যবস্থা করে স্কুলের জন্য বের হতে হয় ঊর্মিকে। বাড়িতে ফুপু আর আম্মুজান থাকেন আর থাকে রাকিব। ফুপাতো ভাইজান বলে রাকিবকে সহ্য করে ঊর্মি, নইলে কবেই বাড়ি থেকে বের করে দিতো ৷ রাকিব আব্বুর বাজারের বড় জামা-কাপড়ের দোকানটা সামলায়। কিন্তু না সংসারে টাকা দেয়, না কোনো হিসাব দেয়। ফুপুকে বললে বলে, সবকিছুর হিসাব আছে, সবকিছু তো তোর জন্যই৷ আম্মুকে বললে বলে, কী হবে হিসাব করে, রাকিব তো আপনজন। আর তোর আব্বু জমি জায়গা যা করেছেন তাতেই তো সংসার চলে যায়।
ভালো নাম ইসরাত জাহান ঊর্মি। আব্বু বিদেশে থাকেন বলে খালা আর রাকিবকে আব্বু রেখে গিয়েছিলেন আম্মু আর উর্মির কাছে। আজ কত বছর আব্বু বিদেশে চাকরি করেন, আর গত তিন মাস আব্বুর কোনো খোঁজ-খবর নেই ৷ দিন দিন আম্মু চিন্তায় শুকিয়ে যাচ্ছে৷ ঊর্মির কি কম চিন্তা হচ্ছে? আম্মুর সামনে হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করে সবসময়। ঊর্মি জানে, বাড়ি থেকে গেলেই ফুপু মায়ের সামনে যত বিপদের কথাই বলবে। মায়ের ফোলা চোখ দেখে ঊর্মি সব বুঝতে পারে ৷
এখন তো নাকি কোন মাজারে এক ফকিরের কাছে নিয়ে যায় ফুপু। সে বলেছে আব্বু নাকি খুব কষ্টে আছে, তাবিজ করে দেবেন তিনি, আবার আব্বু ফিরে আসবেন। আম্মু কদিন ধরেই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছিলো, কদিন আগে সেসব টের পেয়ে ব্যাংকের সব কাগজপত্র ঊর্মি সরিয়ে রেখেছে। বুঝতে পারছে এসব ফুপুর চালাকি। যত্তসব আজগুবি কথা আর ভয় দেখিয়ে টাকা হাতানোর চেষ্টা ৷ আম্মুকে বলে লাভ নেই , তিনি একান্ত সরল মানুষ।
ঊর্মি জানে আব্বু নিশ্চয়ই কোন সমস্যায় পড়েছেন। সবসময় আল্লাহর কাছে দোয়া করে আব্বু যেন তাড়াতাড়ি ফিরে আসেন। আব্বু বিদেশ থাকে বলে আগে মেহেমানরা বাড়ির মাটি ছাড়ত না, আর আজকাল কেউ খোঁজ নেয় না। একমাত্র নানিজান রোজ ফোন করেন। আম্মুকে দিলাসা দেন। ঊর্মির নানাজান ছিলেন মৌলভি হাজি মানুষ, তার ইন্তেকালের পর নানিজান ঊর্মির বড় খালার কাছে থাকেন৷
আম্মু আমি আসছি, তুমি সাবধানে থাকবা। কোনো সমস্যা হলে আমাকে কল দিবা।
আমার আবার কী হবে, তুই সাবধানে যা। কত খাটাখাটনি তোর। তোর ফুপু ঠিক বলে, তোর শাদি হয়ে গেলেই আমার চিন্তা শেষ। তুই একদিকে কবুল বলবি আমিও তোর ফুপুর সঙ্গে হজযাত্রা করব।
ওটি হচ্ছে না। হজে তো তুমি যাবা, কিন্তু আব্বুর জন্য তুমি কোনো টেনশন নিবা না। আব্বু ঠিক চলে আসবে। আমি বিভিন্ন জায়গায় রোজ খোঁজ নিচ্ছি৷
আমিন৷
আমি আসলাম। আল্লাহ্ হাফেজ।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে রিকশা করে স্কুলে পৌঁছে যায় ঊর্মি। এখানকার স্থানীয় এই স্কুলে ইংরেজি আর ভূগোল পড়ায় ঊর্মি। যদিও আব্বু প্রতি মাসে টাকা পাঠাতো ওদের, তখনও ঊর্মির ইচ্ছা ছিলো নিজের পায়ে দাঁড়ানোর৷ ঊর্মি চেয়েছিল ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে অনেক পড়াশোনা করতে। আব্বু নিখোঁজ হওয়ার পর সামেদা আপা ঠিক করে দেন স্কুলের কাজটা। হিজাবটা ঠিক করে স্কুলে ঢুকতেই মনটা ভালো হয়ে যায় রোজ। কত কচিকাঁচার হইচই ৷ আলহামদুলিল্লাহ! ঘরে বসে থাকলে ঊর্মি আরও মন খারাপে ভুগতো৷
ফুপু চায় ঊর্মি রাকেবের সঙ্গে নিকাহ করে, আর তারপর আব্বুর সবকিছু রাকিবের করায়ত্ত হোক৷ ঊর্মি আম্মুর জন্য কিছু করতে পারে না৷ ফুপুর সব চক্রান্ত বুঝতে পারে। যখন আব্বু সুন্দর বাড়িটা বানিয়েছিল যখন-তখনই ফুপুর নজর ছিলো এই বাড়ির ওপর৷ ফুপার ইন্তেকাল হয়ে গেলে আব্বু নিয়ে আসে ফুপুকে৷ তার আগে থেকেই ঊর্মির রাকেবকে পছন্দ না৷ আর ফুপু চান রাকিবের সঙ্গেই ঊর্মি নিকাহ করুক৷
স্কুল থেকে ফিরতেই আগে আম্মুর কাছে যায় ঊর্মি৷ আম্মু কী কী খেতে ভালোবাসে সব জানে৷ রোজ কিছু না কিছু নিয়ে আসে সে। আম্মু আম্মু...
হায় আল্লাহ্, একি হলো। আমার ভাবির একি হলো?
কী হয়েছে ফুপু? একি আম্মুর কী হয়েছে?
ভাবি পড়ে গেছে। হায় আল্লাহ, ভাইজান নাই, এবার কী হবে?
আব্বু নাই বলো না ফুপু। তুমি ডাক্তার ডেকেছ? আমাকে ফোন করোনি কেন?
রাকিব গেছে কাজি আনতে।
কাজি?
হ্যাঁ, ভাবির শেষ খোয়াইশ তোর নিকাহ, সেটা হলেই ভাবি ভালো হয়ে যাবে।
ঊর্মি দৌড়ে আগে ডাক্তারকে ফোন করে। তারপর স্কুলের টিচারদের। নিজের সব বন্ধু-বান্ধবদের ফোন করে। তারপর নিচে এসে আম্মুর কাছে গিয়ে বলে, তুমি এখান থেকে সরো তো ফুপু৷ তোমরা নিজেদের বাসায় যাবার ব্যবস্থা করো।
মানে? হায় আল্লাহ্ ৷
হ্যাঁ আমি ডাক্তার ডেকেছি, আর শোনো আমি কারোর সাথে নিকাহ করবো না৷ আমার আব্বু সবকিছু আমার নামে করে রেখে গেছেন আর আমি সবকিছু আগেই ঠিক করে নিয়েছি।
তোর দোজখে জায়গা হবে না। এটা গুনাহ ৷ তোর ওপর গজব ...
থামো। নইলে এবার পুলিশ ডাকব।
থাম উর্মি
আম্মু তুমি সুস্থ , তোমার কিছু হয়নি?
না কিছুই হয়নি৷ কিন্তু এর থেকে আমি কবরে গেলে ভালো হতো।
বলেছিলাম না ভাবি তোমার মেয়ে ভালো না। নিশ্চয়ই কোথাও মহব্বত আছে৷
থামো তো। আম্মু আমি সব বলবো, আমাকে তুমি বিশ্বাস করো না?
কিছু সময়ের মধ্যে রাকিব চলে আসে কাজি নিয়ে আর ঊর্মির বন্ধু-বান্ধবরা চলে আসে। কাজি সাহেবের সামনে ঊর্মি সব বলে আর ফুপু রাকিবকে বলে, তোমাদের নিজেদের বাসা আছে, ফুফপু তোমার ছেলে বড় হয়েছে, আগেই আব্বুর দোকানটা সে নিয়ে নিয়েছে , আমি আর দোকান ফেরত চাই না। কারোর সঙ্গে না ইনসাফি হোক আমি চাই না। তোমরা আজই চলে যাবা আমাদের বাড়ি থেকে, আর কাজি সাহেব আমার সব বন্ধু-বান্ধব সাক্ষী থাকুন, আমাদের মা মেয়ের কোনো ক্ষতি হলে এরা হবে দায়ী। আর হ্যাঁ ফুপু আমি মরলেও তোমরা কিছুই পাবা না৷ আমি আগেই উকিল ডেকে সবকিছু এতিমখানার নামে করে রেখেছি৷ এরপরও কোনো ঝামেলা করলে আমি পুলিশে...
ঊর্মির আম্মু খুব কান্নাকাটি করতে থাকে। বলে ওদের যেতে দে ঊর্মি৷ আপু তোমরা যাও ৷ ওর মাথায় জিনে ভর করেছে।
ঊর্মি তখন আম্মুর মাথায় হাত দিয়ে বলে, তুমি শান্ত হও আম্মু ৷ আব্বুর কসম, আমি কোনো অন্যায় কাজ করিনি। আমার আব্বা আজ নিখোঁজ, তখন আমি নিকাহ্ করবো? আম্মু রাকিব আমাদের ঠকায়৷ ফুপু চায় আমি রাকিবকে নিকাহ করি, তুমি বোঝ না? আমি মেয়ে বলে কি আমি আমার জীবনটা নিজের মতো কাটাতে পারি না? মেয়ের নিকাহ দিয়ে তুমি সওয়াব পেতে চাও, আমি চাই না আমার আম্মুর সেবা করে সওয়াব পেতে? তোমাকে মিথ্যা বলেছে সব ফুপু৷ এসব মিথ্যার জাল, ফরিকের মাধ্যমে তোমার কাছ থেকে টাকা লুটে গেছে। রাকিব সেই সব টাকা দিয়ে জমি কিনেছে৷
আমি নিকাহ্ করবো, কিন্তু তার আগে আমি আব্বুর খোঁজ করবো। আমি তোমার মাথার চিন্তা না আমি তোমার সাহস হতে চাই আম্মু৷ কেউ নেই আমার জীবনে, কেউ না। আমি আমার আম্মুকে ছেড়ে কোথাও যাব না। আমি রাগের মাথায় বলেছি সবকিছু ৷
হ্যাঁ আন্টি আমরা সবাই জানি, ঊর্মি নিজের আব্বুকে খোঁজার জন্য আপনাকে নিয়ে বিদেশ যেতে চায় ৷ অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করছে। আপনি ওকে ভুল বুঝবেন না৷
রাকিব আর তার আম্মু চলে গেলে ঊর্মি আম্মুর কাছে ঘুমিয়ে পড়ে৷
কিছুদিন পর ঊর্মি আর তার আম্মু বিদেশযাত্রা করে৷ সেখানে গিয়ে জানতে পারে, তার আব্বু হাসপাতালে, কোম্পানি থেকে ফোন করা হয়েছিলো ঊর্মির আম্মুকে, সেখান থেকে বলা হয়েছে আবদুল্লা নামে কাউকে তারা চেনে না। তারপর থেকে কোম্পানির নাম্বার ব্লক করে দিয়েছে। আবদুলের ফোন নষ্ট হয়ে গেছে। তারপর বিদেশ থেকে দিল্লির অফিসে খবর দেওয়া হয়েছিল সেখানেও কোনো খবর আসেনি৷
আব্বুর মারাত্মক অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল, মাস খানেক কোমায় ছিল তার আব্বু৷
ঊর্মির আম্মু সব চক্রান্ত বুঝতে পেরে যান। তারা ঊর্মির আব্বুকে নিয়ে দেশে ফেরেন। ঊর্মির ফুপু কুমিরের কান্না কাঁদতে এলে ঊর্মির আম্মু দরজা বন্ধ করে দেন৷
বছর তিনেক পর ঊর্মি হায়ার এডুকেশনের জন্য বিদেশ যাচ্ছে। তার আব্বু আর আম্মু তাকে এয়ারপোর্টে ছাড়তে আসে। আম্মু তার মাথায় চুমু দিয়ে বলে, তোর যতখুশি পড়াশোনা কর। জীবন তো একটাই, কিন্তু কথা দে...
আল্লাহর কসম, ফিরেই আগে কবুলনামা পড়ব। তুমি কোনো চিন্তা করো না।
ডিআইএ
ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন